মোঃ এরশাদ আলী / আতিয়া আফরিন
এক
জন্মের পর থকে বয়ঃসন্ধি সময়কাল পর্যন্ত একজন মানুষ শিশু হিসেবে পরিচিত থাকে। শিশুকে সাধারণত নাবালক বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পিতা-মাতার মধ্যেকার সম্পর্ক বোঝাতে এবং গোত্র, জাতি ও ধর্মীয় সদস্য হিসেবে শিশুকে চিহ্নিত করা হয়। তাই নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও পরিবেশ শিশুর সংজ্ঞায়নকে প্রভাবিত করে। যেমন বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে জন্মের পর থেকে নবজাতকে শিশু বলা হয়, আবার বার্ধক্য কালেও মানুষকে শিশুর সাথে তুলনা করা হয়। যাইহোক, শিশুকে সাধারণত তিনটি উপায়ে সংজ্ঞায়ন করা হয়। যথা: ক) আইনগত সংজ্ঞায়ন খ) দৈহিক সংজ্ঞায়ন এবং ৩) সাংস্কৃতিক সংজ্ঞায়ন। শিশু সম্পর্কিত গবেষণা, বিদ্যাতায়নিক বিতর্ক প্রভৃতি শুরু হয়েছিল পশ্চিমা বিশ্বে; যেখানে সারা পৃথিবীর মাত্র ১০ শতাংশ শিশু বেড়ে উঠে। অন্যদিকে বাকী ৯০ শতাংশ শিশুর অবস্থান এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং প্যাসিফিক অঞ্চল সমূহে। তাই শিশু সম্পর্কিত যে কোন বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক নির্ধারিত বা আরোপিত সত্য কতটুকু প্রতিনিধিত্বশীল; সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। একই ভাবে শিশু কারা? এই প্রশ্নের উত্তর যে সার্বজনীন বা চিরন্তন হবে সে বিষয়টিও মানতে নারাজ নৃবিজ্ঞান। শিশুর সংজ্ঞা নির্ধারণে নৃবিজ্ঞান তাই স্থান, কাল, পাত্র ভেদে আপেক্ষিক সংজ্ঞাকে চিহ্নিত করে। একইভাবে, শিশুর সংজ্ঞা নির্দিষ্ট সামাগ্রিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে কতটুকু প্রতিনিধিত্বশীল সে বিষয়টি ও বিবেচনা করে।
শিশুর বেড়ে ওঠা নিয়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিতর্ক প্রচলিত রয়েছে কারণ একেক তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি একেক প্রেক্ষিতের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যেহেতু শিশুর বেড়ে ওঠা একটি গতিশীল বিষয়, সেকারনে কোন একক তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতকে যথার্থ বলে ধরে নেওয়াও সহজ ও সঙ্গত হয় না। বরং এই যে বিভিন্ন তত্ত্বগত পার্থক্য, সেগুলোর মাধ্যমে শিশুর বেড়ে ওঠার সকল দিক স্পষ্ট হয়ে যায়। শিশু বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধান তাত্ত্বিক মতাদর্শগুলো হচ্ছে সাইকো-এ্যানালেটিক্যাল থিওরি ,কগনিটিভ থিওরি, বিহ্যাভিওরাল এ্যান্ড সোস্যাল কগনিটিভ থিওরি, ইকোলজিক্যাল থিওরি এবং ইথোলজিক্যাল থিওরি। এই বিভিন্ন তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো একটি অপরটির প্রতিযোগী নয় বরং পরিপূরক। কারণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি অন্যটির চেয়ে ভিন্নতর একটি প্রেক্ষিতকে গুরুত্ব দেয়, ফলে এগুলোর সম্মিলনে সকল বিষয় উঠে আসা সম্ভব।
সাইকো-এ্যানালেটিক্যাল থিওরি শিশু বিকাশের ক্ষেত্রে তার মনোদৈহিক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়। বিকাশ, এ ধারার তাত্ত্বিকদের মতে, প্রথমত একটি অসচেতন ব্যক্তির বা আবেগের রঙের তাঁদের মতে আচরণ হল বাহ্যিক একটি বিষয় এবং শিশু বিকাশকে বুঝতে হবে তার আচরণ এবং মনের গভীরতর কর্মকান্ডের প্রতীকী অর্থ হিসেবে। এ তত্ত্ব মতে, বাবা-মা’র সাথে শিশুর শৈশবের অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। এ ধারার তাত্ত্বিকগণের মধ্যে অগ্রগণ্য সিগমন্ড ফ্রয়েড এবং এরিক এরিকসন
সিগমন্ড ফ্রয়েড এর তত্ত্বকে বলা হয় মনো যৌনতাবিষয়ক তত্ত্ব যা তিনি শিশু বেড়ে ওঠাকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করেছেন। মূলতঃ তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসা মানসিক রোগীদের কাছ থেকে তাদের শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা শুনে এতত্ত্ব দাঁড় করান। ফ্রয়েড এর মতে, ব্যক্তিত্বের তিনটি ধাপ আছে। যথা: a. the id, b. the ego, c. the superego. id ফ্রয়েড আখ্যায়িত করেছন সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে যা ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক শক্তির যোগান দেয়। তাঁর মতে, সম্পূর্ণ অসচেতন id এর বাস্তবের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। তারপর শিশু যখন বাস্তবের প্রয়োজন ও বাধা বিপত্তির অভিজ্ঞতা লাভ করে তখন তার মধ্যে ধীরে ধীরে ego-এর বোধ সঞ্চারিত হয়। এ সময় থেকে যে কারণ অনুসন্ধান শুরু করে এবং এজন্য এ পর্যায়কে বলা হয় শিশু ব্যক্তিত্বের নির্বাহী অংশ। id ও ego–এর মধ্যে কোন আদর্শের বোধ থাকে না। ঝঁঢ়বৎমড় হচ্ছে ব্যক্তিত্বের সেই সর্বোচ্চ পর্যায় যেখানে শিশু কোনকিছুর ন্যায় অন্যায় বিষয়ক ভাবনা দাঁড় করাতে চায়। একে বলা হয় ব্যক্তিত্বের আদর্শিক অংশ। ফ্রয়েড দেখেছেন প্রাপ্ত বয়সের সমস্যাগুলোর উৎসমূল মানুষের শৈশবের অভিজ্ঞতা। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ মনস্তাত্ত্বিক ও যৌন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে আর বেড়ে ওঠার পাঁচটি পর্যায় রয়েছে। a. oral stage, 2. aral stage, 3. phallic stage, 4. Latency stage, 5. Genetial stage । ফ্রয়েড এর এই তত্ত্বের সমালোচনা আছে প্রচুর। অনেকের মতে, ফ্রয়েড শিশুর কেবল যৌন বিকাশকে গুরুত্ব দিয়েছেন, যা যথেষ্ট নয়। ডোনাল্ট উইনরুকাট এর মতে, “ ফ্রয়েড শৈশব আলোচনায় শৈশবকেই অবহেলা করেছেন।”
আবার অনেকের মতে, সিগমন্ড ফ্রয়েড এর তত্ত্ব শিশু বিকাশের ক্ষেত্রে সামাজিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয় না। এ প্রেক্ষিত অনেক মনোবিশ্লেষনিক তত্ত্বের উন্মেষ ঘটে যেগুলো ব্যক্তির বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে যৌনতা বিষয়ক প্রকৃতিগুলোর চাইতে সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ তত্বগুলোতে অবচেতন মনকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হলেও চেতন মনকেও অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। এই ধারার তাত্ত্বিকগনের মধ্যে এরিক এরিকসন অগ্রগণ্য। এরিক এরিকসন বলেন, মানুষ বেড়ে ওঠে সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে, যৌন মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে নয়। তাঁর তত্ত্বের মূল দাঁড়িয়ে আছে মানুষের আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের মধ্যে। মানুষের বিকাশের উদ্দীপনার ধরনটা সামাজিক এবং মানুষ একজনের সাথে আরেকজনের যোগাযোগের আকাঙ্খার মধ্যে তা প্রতিফলিত হয়। মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশে তার সারা জীবনের অভিজ্ঞতাই অত্যন্ত জরুরী। তিনি মানব জীবনকে আটটি বিকাশ স্তরে ভাগ করেছেন এগুলো তাঁর ভাষায় সাইকো-সোস্যাল কাজ। তাঁর মতে, প্রতিটি বিকাশ স্তরের একটি মানুষ স্বতন্ত্র সঙ্কটে পড়ে যেগুলো থেকে সফলভাবে উত্তরন করা জরুরী। তিনি বলেন এগুলো মানুষের জন্য বিপর্যয়মূলক নয় বরং তা ক্রমবর্ধমান বিপন্নতায় মানুষ কে দক্ষতার সাথে বেঁচে থাকতে শেখায়। এসব সঙ্কটে মানুষ যদি ভালোভাবে উতরে যায়, তাহলে তার বিকাশ স্বাস্থ্যকর হয়।
কগনিটিভ ধারার তাত্ত্বিকগণ শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে তাদের সচেতন চিন্তাকে গুরুত্ব দেন। এই তাত্ত্বিক ধারাটি প্রতিষ্ঠিত শিশুর বোধগত বিকাশকে কেন্দ্র করে। এই ধারার তাত্তিকগণের মধ্যে জেন পিয়াগেট অত্যন্ত প্রভাবশালী। জেন পিয়াগেট তাঁর তত্ত্বে নির্দিষ্ট বয়সে ব্যক্তির নির্দিষ্ট চিন্তা বা দর্শনগত কাঠামো ও কৌশলকে গুরুত্ব দেন যেগুলো মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্থ তৈরিতে সহায়তা করে। তাঁর মতে, শিশুরা খুবই সক্রিয়ভাবে পৃথিবী সম্পর্কে নিজেদের বোঝাপড়া তৈরী করে। এই বোঝা পড়া ব্যক্তি এবং তার বিষয়বস্তুর মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টাই নিহিত। পৃথিবী সম্পর্কিত চিন্তার জায়গাটি ২টি প্রক্রিয়ার আসে। প্রথমত, সংগঠন এবং দ্বিতীয়ত, অভিযোজন। পৃথিবীর জ্ঞান অর্জন করতে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার সংগঠন ঘটাই। আবার ভবিষ্যতে কাজে লাগানোর জন্য আমরা নতুন নতুন বোঝাপড়ার অভিযোজন সম্পন্ন করি। জেন পিয়াগেট -র মতে, এই অভিযোজন দুই ভাবে ঘটে। যথা: আত্তীকরণ এবং সামঞ্জ্যস্যাবিধান।
প্রাণী আচরণ বিজ্ঞানসম্মতভাবে নিরীক্ষনের জন্য ইথোলজিক্যাল থিওরি-র যাত্রা। এ ধারা মতে, মানুষের আচরণ তার জৈবিক অবস্থা ও বিবর্তন দিয়ে জোরালোভাবে প্রভাবিত। আর বিভিন্ন জিনিসের প্রতি আমাদের স্পর্শকাতরতা জীবনের নানা পর্যায়ে বদলে যায়। এক কথায় আমাদের জীবনে জটিল স্পর্শকাতর পর্যায় আছে। যদি আমরা এই পর্যায়গুলোতে এরকম অভিজ্ঞতা অর্জন করতে না পারি, তাহলে আমাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ ধারার যাত্রা শুরু হয় প্রাণীবিদ কোনরার্ড লরেঞ্জ-র হাত ধরে। তিনি গ্রেল্যাগ গেইস নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে, এই প্রজাতির বাচ্চাগুলো জন্ম নেয়ার পরপরই তাদের মাকে অনুসরন করে। এখানে মা বলতে সেগুলোর আশেপাশে তাদের মা বা অন্য কোন প্রজাতির সদস্য হলে তাকেই বোঝে। এ ধারার তাত্ত্বিকগণ তাই জৈবিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেন।
ইকোলজিক্যাল ধারা শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবেশকে গুরুত্ব দেয়। ব্রোফেনব্রেইনার মত প্রকাশ করেন, মানুষের বিকাশ ঘটে পাঁচটি পরিবেশগত পর্যায়ের মধ্য দিয়ে।
১. মাইক্রোসিস্টেম ঃ মানুষ যেখানে বাস করে, সেই পরিবেশকে বোঝায়। মানুষের পরিবার,সঙ্গী-সাথী,বিদ্যালয় ও প্রতিবেশীরা এর মধ্যে থাকে। এটি মানুষের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নির্দেশ করে।
২. মিওসোসিস্টেম ঃ মাইক্রোসিস্টেমগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক নির্দেশ করে এটি।
৩. এক্্েরাসিস্টেম ঃ আলাদা একটি জায়গা যা একজন মানুষের জীবনচরনকে প্রভাবিত করে। যেমন- চাকরির ক্ষেত্র।
৪. ম্যাক্্েরাসিস্টেম ঃ একজন মানুষের সমগ্র সংস্কৃতিই বা জীবনাচরন এর অর্ন্তগত।
৫. ক্রমোসিস্টেম ঃ পরিবেশ তাত্ত্বিক ঘটনা যেগুলো মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, তাই ক্রমোসিস্টেম। সামাজিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতগুলোও এর প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। নৃবিজ্ঞানের গবেষনার প্রয়োজনে উক্ত তাত্ত্বিক আলোচনার গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক। উক্ত তত্ত্ব উদ্ভাবনের কারনে গত দুই দশকে নৃবিজ্ঞান সহ অন্যান্য তত্ত্ব জগতে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছে।
শিশু বিষয়ক অধ্যয়নে শৈশবের দর্শন বর্তমানে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। এ দর্শনে শৈশব সম্পর্কিত নানা প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করা হয় যেমন শিশু সম্পর্কিত মানুষের ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি, শৈশব এবং সম্পর্কিত তত্ত্বাবলী, শিশু অধিকারের তত্ত্ব, শিশুদের শিল্প-সাহিত্যের অবস্থা ও তাৎপর্য সংস্কৃতিভেদে শিশুদের অধ্যয়ন প্রভৃতি। এ্যারিজ ফিলিপ্পই তার বই সেনঞ্চুরী আব চাইল্ডহুড-এ উল্লেখ করেছেন , শৈশবের ধারণা ইতিহাস ও সংস্কৃতি নির্মিত। তার মতে , মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় চিত্রকলায় (শিশু যিশুর চিত্রকলা সম্বলিত) শিশুদের চেহারা যে আদল পাওয়া যায়, তাতে তাদের ছোট প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে এপ্রসঙ্গে শুলামিথ সাহার বলেন সেইসময়ও শিশুদের সুনির্দিষ্ট বয়স-পর্যায়ে ভাগ করা যেত।
বর্তমানে শিশু বিষয়ক কেন্দ্র করে যে ধারণা প্রচলিত তার উৎপত্তি এ্যারিস্টটলের হাত ধরে। তার মতে, চার ধরনের কারণ আছে যার একটি হচ্ছে প্রধান কারণ এবং অন্যগুলো সাধারন কারণ। প্রধান কারণের মধ্য দিয়ে মানুষ পূর্নবয়স্কতায় পৌছায় এবং এর পর জৈব অঙ্গানুগুলোর কাজ করে। সাধারন কারণগুলোর মধ্য দিয়ে পূর্বে গঠিত কাঠামো সঠিকভাবে কাজ করা শুরু করে। এই দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে শিশু হল মানুষের অঙ্গগুলোর অপূর্নাঙ্গ নমুনা যেগুলোর বড়দের মত নির্দিষ্ট কাঠামো ও গড়নে পরিণত হয়ে কাজ করবার যোগ্যতা রয়েছে। এ্যারিস্টটলের এই দৃষ্টিভঙ্গির দুটি পরিশীলন দেখা যায়। একটি হল ১৯ শতকের ওনটোজেনি রিক্যাপিসুলেটস সাইলোজেনির ধারণা বলে যে ব্যক্তির উন্নয়ন আসলে নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন ও ইতিহাস অনুযায়ী ঘটে। পিয়াগেট এর প্রথম দিকের আলোচনায় এ বিষয়গুলো দেখা যায়। অন্য আরেকটি ধারা হল বয়সভিত্তিক পর্যায় যা পুরোপুরি কাঠামোগত পরিবর্তনকে ধারন করে। প্রাচীন চিন্তাকদের চিন্তায়ও এটি ছিল।
রুশো পাঁচটি বয়সভিত্তিক পর্যায় নির্ধারণ করেন যেগুলোর মধ্য দিয়ে একজন মানুষ আদর্শগত পূর্ণঙ্গতা অর্জন করে। তিনি লকলসি-র রিজন উইথ চিল্ড্রেন-র এ ধারণা ত্যাগ করে বলেন ৩ বছরের নীচের শিশু বিকাশগত ভাবে যথাপযুক্ত নয়। পিয়াগেট এর দ্যা মোর্যাল জাজমেন্ট আব দ্যা চাইল্ড ধারার মধ্য দিয়ে এ তত্ত্বের জন্ম যা পরবর্তীতে লরেন্স কোহালবার্গ-র লেখায়ও আসে। তার মতে, ছয়টি পর্যন্ত পর্যায়ে শিশুর নৈতিকতা বিকশিত হয়। অল্পকিছু শিশু পঞ্চম ও ষষ্ঠ পর্যায়ে পৌছায়। তবে এর সমালোচনা করে ক্যারল গিলিলগ্যান বলেন, এই স্তর বিভাজ নটা পুরুষ তান্ত্রিক চিন্তার ফল।
দুই
কোন কিছু এমনি এমনি বা একদিনে শুরু হয় না। শুরুর একটা কারণ থাকে। যেহেতু মানব ইতিহাসের শুরুর ধাপ শিশু তাই শিশুকে নিয়ে বিভিন্ন জল্পনা কল্পনা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। একটি শিশু কখন কিভাবে এবং কেন সমাজের বা মানুষের কাছে গবেষণার কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসে বা এসেছে এরও একটা ইতিহাস রয়েছে। আমরা যদি সভ্যতার প্রথম দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে, প্রথম দিকে শিশুদের আলাদা করে ভাবা হত না। তাদেরকে বড়দেই একটি অংশ মনে করা হতো। এমনকি মেয়ে শিশু জন্ম গ্রহণ করলে তাকে মেরে ফেলা হত। কিছু কিছু সমাজের শিশুদের অভিশাপ মনে করা হত। বিভিন্ন গল্প, রূপকথা ও কাহিনীর মধ্যদিয়ে নারীরা যে তার পিতা, স্বামী বা ভায়ের অধীনস্ত তা ফুটিয়ে তুলে সকলের মনে বিশ্বাস স্থাপনের চেষ্টা করা হয়। যেহেতু শিশুরা ও বড়রা একই নয় তাই ১৮ শতকের শেষে শিশুদের নিয়ে আলাদা ভাবনা শুরু হয় এবং তাদেরকে নিয়ে কিছু গবেষণা শুরু হয়। শিশুদের আলাদা আলাদা কিছু সময়কালেও গবেষণা শুরু হয়েছিল। মধ্য যুগ এবং রেঁনেসা যুগে মূলত শিশুদের নিয়ে আলাদা আলাদা অধ্যয়ন শূরু হয়। আধুনিক ইউরোপের প্রথমদিকেই ইউরোপ শিশুদের জন্য কিছু বিদ্যালয় ও শিক্ষালয় গড়ে তোলা হয়েছিল। আলোকিত সময়ে জ্ঞান বিজ্ঞানের পূর্নাংগ বিকাশ শুরু হয়। শিশুদের কি ভাবে জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোকিত করে গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা এবং তা নিয়ে অনেক ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ধর্মীয় রিফরমেশনের সময়ে ধর্মের বিস্তার এবং ধর্মীয় নীতির প্রবর্তন ও পরিবর্তন করা হয়। এই সময় শিশুদের পরিবারের সাথে যুক্ত করে রাখার কথা বলা হয়। এবং শিশুদেরকে সমাজে প্রকৃত মানুষ বা উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য পরিবারকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে বলা হয়। আধুনিক যুগে এসে সবকিছুতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে সব বিষয়কে নির্দিষ্ট ও তার মত করে দেখাও শুরু হয়। কাকে শিশু বলা হবে আর কাকে বলা হবে না।
ইউরোপে ১১১৭ সালে ব্ল্যাক লিজেন্ট নামে একটি সংস্থা গড়ে ওঠে। এটার মাধ্যমে কিছু জার্নাল ও বই প্রকাশিত হয় শিশুদের নিয়ে। ফিলিপ এ্যারিকস (১৯৬২) তার দ্যা হিসটোরি আব চাইল্ড বই বলেন, প্রাচীন যুগে শিশুদের প্রতিভা ছিল না। আধুনিক যুগে শিশুদের প্রতি ভালবাসার মাধ্যমে জনসংখ্যা কামনোর চেষ্ট করা হয়। এবং পরিবারে অল্প সন্তানের প্রতি পিতার মাতার ভালবাসা বৃদ্ধি পায়। সালামিথ সাহারা (১৯৯০) বলেন , মধ্যযুগে মানুষরা শিশুদের ও বড়দের মানসিক ও নেতিবাচক নিয়ে ভাবতে এবং ছোটরা বড়দের থেকে কম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন তারা তা বুঝাতে পেরেছিল। ডেভিট আনেহ্যান্ড (১৯৯৩) বলেন, শিশুরা তাদের দৈহিক, বৃদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাভাবনায় বড়দের থেকে অনেক পিছিয়ে এবং বড়দের উচিত তাদেরকে সঠিকভাবে পরিচালনা ও যন্ত নেওয়া। এ্যাডওয়ার্ট স্ট্রম উল্লেখ করেন যে, আজকের যে শৈশব এবং শিশুদের আলাদা করে দেখার সুযোগ তার প্রকৃত ফল হল রোমান্টিক ভালবাসা, তিনি বলেন,ক্যাপিটালিজম এবং ব্যাক্তিস্বাতন্দ্রতাবোধ এ একক পরিবার শিশুদের ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল বয়ে আনে। কিন্তু প্রাচীন সমাজে বেশীরভাগই ছিল যৌথ পরিবার যার ফলে এমনটি ঘটত না। বর্তমানে বর্ধিত পরিবারের মাধ্যমেও শিশুদের বিকাশ সম্পর্কে ভাবা হয়ে থাকে।
১৮০০ শতকে এসে শিশুদের নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা এবং বৈজ্ঞানিক ভাবে পদ্ধতি প্রয়োগ, আবেগ ও মানবিক দিক সহ সকল বিষয় কে প্রয়োগ করে শিশুদের লালন পালন করার কথা নিক্কোস রোজ উল্লেখ করেন। কারণ এমন এক সময় ছিল মৃত্যুর হার এত বেশি ছিল যে পরিবারে মধ্যে ভীতি কাজ করতে যে শিশু জন্ম দেওয়া মানে মৃত্যুর মুখোমুখী হওয়া। ধীরে ধীরে উনিশ ও বিশ শতকে এসে শিশুদের নিয়ে ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। সকল উন্নত দেশ সমূহে শিশুদের নিয়ে অনেক কাজ, গবেষণা সম্পন্ন হয় এবং বিভিন্ন সংস্থা গড়ে উঠে। যাতে করে শিশুদের সুস্থ ভাবে বেড়ে তোলা যায়। সেই সাথে কোন বয়সের শিশুদের শিশু বলা যাবে তার মাপকাঠিও ঠিক করা হয়। জাতিসংঘ ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু বললেও বিভিন্ন দেশ সংগ্রহ অনুযায়ী শিশুর সংজ্ঞা ঠিক করার প্রয়োজন হয়। কেননা কোন কোন দেশে ১২-১৫ বছরের মত ছেলে মেয়েরা যৌবন প্রাপ্ত হয় আবার অনেক দেশে ১৮ বছরের পরেও যৌবন প্রাপ্ত হয় না। এভাবে দেশ ও সংস্থা ভেদে শিশুদের নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে গবেষণা করা হয়।
সভ্যতার দ্বার প্রান্তে এসে শিশুদের পরিবারের অন্তর্ভূক্ত করা হল। বলা হল শিশুর হল একটি পরিবারের সম্পদ এবং একে রক্ষা করা দায়িত্ব তার পরিবারেরই। এভাবে শিশুদের নিয়ে সভ্যতার শুরুতে অল্প করে আলোচনা শুরু হলেও বর্তমান সভ্যতার চরম বিকাশের সময় শিশুদের নিয়ে অনেক ধরনের স্টাডি, গবেষণা এবং নিয়ম নীতির মাধ্যমে শিশুকে সমাজে উপযোগী করে তোলার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দ্যা হাইতি প্রজেক্ট একটি বির্বতনিক গবেষণা হিসেবে পরিচিত। সেখানে শিশুর পুষ্টির বিষয়ে, পরিচর্যার বিষয়ে অভিভাবকের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তেরেস ব্লঁসে রচিত, (সৈয়দ আজিজুল হক অনুদিত) বাংলাদেশের শিশু অধিকার (হারানো শৈশব? তার ইতিকথা) বইটিতে শিশুর শৈশবগত ধারণাগত দিকসমূহ বিশেষ ধরনের শৈশব, শৈশব ও রাষ্ট্র, মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে এক উক্ত বিষয় সম্পর্কে অনেক ধারণা প্রদান করেছে। শিশু সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে বর্তমানে অনেক প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প উপন্যাস, শর্ট মুভি, চিত্র শিল্পী তৈরী হচ্ছে।
মানবজীবনের বৃহত্তর যে পর্যায় গুলো রয়েছে, শৈশবকাল সেগুলোর প্রথম ও প্রারম্ভিক পর্যায়। পূর্নাঙ্গ মানুষ হবার প্রাক সময়টায় সাধারণত একজন মানুষ শিশু একজন মানব/মানবী” হলেও তার রয়েছে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য যা প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় অন্য রকম। এই বৈশিষ্ট গুলোর ভিত্তিতে শিশুকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। একটি ভ্রুন জন্ম নেওয়ার পর মানবশিশু হিসেবে বেড়ে উঠে এবং তার পর কালক্রমে পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়। সমস্ত বিষয় সম্পাদিত সবকটি পর্যায়ের সকল উত্তরন তাকে একজন সফল মানুষে পরিণত করে কারণ উত্তরনের প্রতিটি পর্যায়ে তার শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এক পর্যায়ের পরিবর্তন নতুন পর্যায়ে নতুন পরিবর্তেন অন্তর্ভূক্ত হয়।
লেখক : মোঃ এরশাদ আলী , গবেষনা কর্মকর্তা এবং আতিয়া আফরিন , সহকারী গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ ( বারসিক)-এ কর্মরত
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন