ক্রান্তিকালীন আচার-অনুষ্ঠান- প্রেক্ষিত ডালু আদিবাসী সম্প্রদায়


 মোঃ এরশাদ আলী *

একজন মানব সন্তান জন্মলাভের পর তার শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির সাথে সাথে তার সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তন হয়। স্বাভাবিক ধারায় একজন মানব সন্তান জন্মের পর শৈশব, কৈশর পার করে প্রাপ্ত বয়সে বিবাহ বন্ধনের আবদ্ধ হয় এবং মৃত্যু বরণের মাধ্যমে মানব সমাজে তার শারীরিক অনুপস্থিতি নিশ্চিত হয়। জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি যেসব স্তর অতিক্রম করে তার প্রত্যেকটি হচ্ছে মানব জীবনচক্রের একেকটি অংশ। জীবনচক্রে একজন মানব সন্তান তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি অনুযায়ী কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। জীবনচক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান পৃথিবীর বহুসংখ্যক সমাজ ব্যবস্থাতে প্রচলিত রয়েছে; তবে সামাজিক দর্শন, প্রচলিত বিশ্বাস ও রীতি-নীতি পালনের ক্ষেত্রে সমাজভেদে ভিন্নতা রয়েছে। জীবনসংকট সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠান হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যা সামাজিক পরিবর্তনশীলতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এই আচার-অনুষ্ঠানগুলো ব্যক্তির অবস্থাগত পরিবর্তনকে প্রতীকি অর্থে ও নাটকীয় পন্থায় সমাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ব্যক্তির জীবনের এসব পরিবর্তনশীলতার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে সমাজে স্থিতিশীলতা, নিয়মকানুন ও রীতিনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। 

জীবনচক্রে মানুষ একটি জীবনব্যবস্থা থেকে অপর একটি জীবনব্যবস্থায় গমন করে। মূলত, দৈহিক ও মানসিক বিকাশের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তন হয়। ব্যক্তির পরিবর্তীত অবস্থানকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সমাজের সদস্যের কাছে সেসব পরিবর্তনসমূহ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা পৌছানো হয় বৈচিত্র্যময় আচার-অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে। প্রচলিত এই আচার-অনুষ্ঠানকে ক্রান্তিকালীন আচার-অনুষ্ঠান (জরঃবং ড়ভ চধংংধমব) বলা হয়। ডালু সমাজে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বৈচিত্র্যময় ক্রান্তিকালীন আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়, যেমন- পঞ্চামৃত , মৃত্যু, সমাধিকরণ ও পারলৌকিক ক্রিয়াসহ ইত্যাদি

উল্লেখ্য ডালুরা ইন্দো-মঙ্গোলয়েড গোষ্ঠীর একটি শাখা (জেংচাম, ২০০৭:৯)। এ প্রসঙ্গে আরো বলা হয় যে, ডালুরা মঙ্গোলীয়ান মহাসমাজের তিব্বতী শাখার একটি অংশ (আইয়োব, ২০০৭:১১৫)। ডালুদের স্বতন্ত্র জাতি পরিচয় সম্পর্কে জেংচাম তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে, ডালুরা নিজেদেরকে বিখ্যাত মহাকাব্য মহাভারতখ্যাত তৃতীয় পাণ্ডব মহাবীর অর্জুনের পুত্র বভ্রুবাহনের বংশধর বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। শপথ ভঙ্গের পরিণামে একাকী বসবাসকালে অর্জুন বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণরত অবস্থায় প্রাচীন মণিপুর রাজ্যে উপনীত হলে সেখানকার রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার রূপে মুগ্ধ হয়ে তার পানিগ্রহণ করেন এবং সেখানে কিছুদিন অতিবাহিত করেন। পরবর্তী সময়ে চিত্রাঙ্গদা অর্জুনের ঔরষে একটি পুত্র সন্তান লাভ করেন এবং তার নামকরণ করেন বভ্রুবাহন। বভ্রুবাহন দীর্ঘ দিনব্যাপী প্রবল পরাক্রমে মণিপুর রাজ্য রাজত্ব করেন। জনশ্র“তি মতে, তাঁরই অধঃস্তন পুরুষ সুবলা সিং মতান্তরে ঢাল্জী শত্র“পক্ষ কর্তৃক স্বদেশ ভূমি মণিপুর হতে বিতাড়িত হয়ে স্বীয় দলবলসহ আসামের পুরো মধ্যাঞ্চল এবং দুর্গম গারো পাহাড় অতিক্রম করে বর্তমান বাংলাদেশের সন্নিকটে সীমান্তবর্তী এলাকায় ভোগাই নদীর তীরে বারেঙ্গাপাড়া নামক স্থানে প্রথম বসতিস্থাপন করেন। যে স্থানটিতে ঢাল্জী সদলবলে বসতিস্থাপন করেন সে স্থানটি পরবর্তী সময়ে তাঁর নামানুসারে ডালুকিল্লা নামে পরিচিতি লাভ করে এবং ওই স্থানই বর্তমানের ডালুবাজার বলে মনে করা হয়। উত্তরকালে এ ডালুবাজার বা ডালুগাঁওকে কেন্দ্র করেই উত্তরে হাড়িগাঁও হতে দক্ষিণে হাতিপাড়া, কুমারগাতি, সংড়া, জুগলি প্রভৃতি স্থানে এবং কংশ নদীর পাড় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ডালুদের বসতি গড়ে ওঠে (২০০৭:৪০৯)। ডালুদের জাতিগত পরিচয় প্রসঙ্গে ‘‘ ময়মনসিংহের জনসমাজ ’’ প্রবন্ধে খগেস কিরণ তালুকদার উল্লেখ করেন যে, ডালুরা গারো সম্প্রদায়ের রোগা কৌমভুক্ত, গারোদের মতই এদের মাচং ছিল এবং ডালুরা গোনারদি নামক কাশ্মিরী ক্ষত্রিয়ের বংশধর। পশ্চিম ভারতীয়  ক্ষত্রিয়দের দ্বারা বিতাড়িত জনৈক দল্লক বা দলক নামক রাজা ডালুতে এক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা থেকে ডালু শব্দের উৎপত্তি (আইয়োব, ২০০৭:১১৫-১১৬)। এছাড়া ডালুদের সম্পর্কে আইয়োব তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, আচার-আচরণ, বেশ-ভূষা, খাদ্য-পানীয় রীতিনীতি ও সামাজিক ক্রিয়া-কর্মে ডালুদের সাথে হাজং জতিগোষ্ঠীর সাদৃশ্য থাকলেও ডালুরা মনে করে তারা মণিপুরী ক্ষত্রিয়দের অনুরূপ (২০০৭:১১৫)। 

পঞ্চামৃত 
ডালু সংস্কৃতিতে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী গর্ভবতী নারীকে উদ্দেশ্য করে যে সব আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয় তার মধ্যে পঞ্চামৃত একটি। গর্ভকালের ৭ম মাসের যেকোন শুভ দিনে গর্ভবতী নারীর জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয়। পঞ্চামৃত অনুষ্ঠানের দিন গর্ভবতী নারীকে খাওয়ানোর জন্য পাঁচ প্রকারের পাকা ভোগের (রান্না করা মিষ্টান্ন দ্রব্য বা মিষ্টি) আয়োজন করা হয়। মিষ্টিদ্রব্য গর্ভবতী মাকে খাওয়ানো শেষ হলে উপস্থিত সবাই অবশিষ্ট অংশ খেতে পারে। পাঁচ প্রকারের মিষ্টি দ্রব্য খাওয়ানো হয় বলে এই অনুষ্ঠানের নামকরণ হয়েছে পঞ্চামৃত। সাধারণত গর্ভবতী নারীর শাশুড়ী অথবা পরিবারের বয়োঃজ্যেষ্ঠ কোন ব্যক্তি মিষ্টি খাওয়ানোর কাজে অংশগ্রহণ করে।                

গর্ভকালীন ও প্রসব পরবর্তী বাধা-নিষেধ ও বিশ্বাস
ঐতিহ্যগতভাবে ডালু গর্ভবতী নারীরা গর্ভকালীন সময়ে কিছু ঘটনা ও নিয়ম-নীতিতে বিশ্বাস করে। প্রচলিত বিশ্বাসগুলোকে মেনে চলার জন্য প্রাত্যহিক জীবনের কর্মকান্ড পরিচালনার সময় কিছু কিছু বাধা-নিষেধ পালন করে, যেমন-
ক্স গর্ভবতী নারীর স¦াস্থ্যের ক্ষতি এবং সন্তানের অমঙ্গল হয় এ বিশ্বাস থেকে গর্ভবতী নারী ঘোরদুপুর (পূর্ণাঙ্গ দুপুর), সাতসকাল (সকালের প্রথমভাগ) ও কালীসন্ধ্যা (সন্ধ্যার শুরু) বেলায় সাধারণত ঘরের বাইরে বের হয় না। 
ক্স গর্ভবতী নারী যদি রাতের বেলা বাইরে বসে থাকে এবং তার (গর্ভবতী নারী) মাথার ওপর দিয়ে পাখি উড়ে যায় তাহলে ডালুদের বিশ্বাস অনুযায়ী ওই মায়ের গর্ভে রুগ্ন অথবা মৃত সন্তান জন্মলাভ করবে। 
ক্স ডালুদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে, চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ চলকালীন সময় যদি কোন গর্ভবতী নারী মাছ কাটার সময় মাছের কান কেটে ফেলে তাহলে জন্মসূত্রে তার (গর্ভবতী নারী) সন্তানের কান কাটা হবে।  
ক্স চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ চলকালীন সময় যদি কোন গর্ভবতী নারী মাছ কাটার সময় মাছের ঠোঁট কেটে ফেলে তাহলে জন্মসূত্রে তার (গর্ভবতী নারী) সন্তানের ঠোঁট কাটা হবে।
ক্স গর্ভকালীন সময় যদি কোন গর্ভবতী নারী বাঁশের কঞ্চি কাটে তাহলে পেটের সন্তানের আঙ্গুল কাটা যাবে। 
ক্স প্রসব পরবর্তী সময়ে প্রায় ১৫ দিন পর্যন্ত শিশুর মায়ের দেশী লাউ, চালকুমড়া খাওয়া নিষেধ থাকে।

শিশু জন্ম পরবর্তী আচার-অনুষ্ঠান
ডালুরা বিশ্বাস করে জন্মের পর নবজাতক শিশু এবং মা কাঁচা (নাজুক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে) অবস্থায় থাকে। তাই নবজাতক ও মায়ের শারীরিক সুস্থ্যতার বিষয়টি চিন্তা করে তাদেরকে আলাদা ঘরে রাখা হয় এবং পরিবারের বাইরে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সংস্পর্শে রাখা হয় না। আইয়োব তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন, কোন ডালু পরিবারে শিশু জন্মের পর এক মাস পর্যন্ত অশৌচ পালন করার নিয়ম প্রচলিত ছিল (২০০৭:১১৯)। 

কিন্তু ডালুদের ‘মহিমার্ণব শ্রীযুক্ত ডালুবর্গের চৌদ্দ আনীর সালিসী’ নামক ১৩২৩ বঙ্গাব্দের প্রাচীন একটি দলিলে লেখা ধর্মীয় নিয়মাবলীতে উল্লেখ আছে যে, সন্তান প্রসবের ১০ দিন পর জাতক্রিয়া আচার পালন করার মাধ্যমে নবজাতক, মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য শুদ্ধ হবে (সূত্র: মুদ্রিত প্রাচীন দলিল)। বর্তমানে প্রচলিত নিয়মানুযায়ী, শিশু জন্মের ১০দিন পর্যন্ত, কোন কোন ক্ষেত্রে ১১দিন পর্যন্ত নবজাতক, নবজাতকের মা এবং পরিবারের সদস্যদেরকে অশৌচ পালন করতে হয়। সনাতনী প্রথা অনুযায়ী অশৌচ চলাকালীন সময় মা ও সন্তানকে পরিবারের মূল বসবাসের ঘরে রাখা হত না; তাদের  জন্য মূল ঘরের বাইরে আরেকটি নতুন করে ঘর তৈরি করা হত। প্রচলিত ডালু ভাষায় এই ঘরকে জাতক ঘর বলে। আইয়োব তার গ্রন্থে ডালু সমাজে প্রসূতী ও নবজাতকের জন্য নির্মিত আবাসন ব্যবস্থাকে ‘আতুরঘর’ হিসেবে উল্লেখ করেন (২০০৭:১১৯)। বর্তমানে পরিবারের মূল বসবাস ঘরের একটি অংশ পরিস্কার করে সেখানে নবজাতক ও মায়ের বসবাসের জন্য জাতকঘর তৈরি করা হয়। এখন জাতক ঘর তৈরির জন্য সনাতনী নিয়মানুসারে বিশেষ কোন দিনক্ষণ বিচার করা হয় না এবং এই ঘর তৈরির ক্ষেত্রে ঘরের সন্মুখভাগ কোন দিকে হবে সেক্ষেত্রে কোন বাধা-ধরা নিয়ম প্রচলিত নেই। 


ঐতিহ্যগত রীতি অনুযায়ী সন্তান জন্মের পর জাতক ঘরের দরজায় মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। কারণ ডালুরা বিশ্বাস করে যে, জন্মগ্রহণের ৭দিন পর হয়লা বুড়ি (অশুভ শক্তির প্রতীকি নাম বিশেষ) নবজাতকের ক্ষতিসাধন করতে আসে। তাই জাতক ঘরে হয়লা বুড়ি যেন প্রবেশ করতে না পারে সেই দিক বিবেচনা করে প্রতিবন্ধক হিসেবে মাছ ধরার জাল দিয়ে জাতক ঘরের মূল দরজা ঘিরে দেয়া হয়। এছাড়াও জাতক ঘরের দরজার সামনে মাটিতে মান্ডা (মান্দা গাছের কাটা যুক্ত ডাল) গাছের কাটা যুক্ত ডাল ও হাসুন (ঝাড়–) রাখা হয়। ডালুরা বিশ্বাস করে যে, জাতক ঘরে প্রবেশ করতে গেলে মান্ডা গাছের কাটা পায়ে বিঁধলে হয়লা বুড়ি জাতক ঘরে প্রবেশ না করে অন্যত্র চলে যাবে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, নবজাতকের মা কোন কারণে জাতক ঘরের বাইরে গেলে পুনরায় জাতক ঘরে প্রবেশের সময় জাতক ঘরের দরজায় এবং নিজের গায়ে থুতু ছিটিয়ে থাকে। ডালুদের বিশ্বাস জাতক ঘরের বাইরে যাওয়ার ফলে যদি কোন খারাপ আত্মা (অশুভ শক্তি) শরীরে ভর (প্রবেশ) করে তাহলে নিজের মুখের থুতু ছিটিয়ে দিলে অশুভ শক্তি তার দেহ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, জন্মপরবর্তী ১০/১১ দিন মা, শিশু এবং জাতকঘরকে অশুচি ধরা হয়। এবং এই সময় পরিবারের সদস্য ব্যতীত কোন ব্যক্তি যদি তাদের ছুয়ে ফেলে তাহলে সেই ব্যক্তিও অশুচি হয়ে যাবে। ফলে অশৌচ চলাকালীন অবস্থায় শিশুর মায়ের জন্য একটি বিশেষ নিয়মে খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবার পরিবেশনের জন্য জাতক ঘরে আলাদা মাটির থাল ও গ্লাস রাখা হয়। খাবারের সময় হলে মা খাবারের জন্য ব্যবহৃত মাটির বাসনপত্র জাতক ঘরের বাইরে রাখে এবং পরিবারের কোন সদস্য জাতক ঘরের বাইরে থেকে পাত্রে খাবার ঢেলে দেয়। অশুচি পর্ব শেষ হয়ে গেলে জাতক ঘরে ব্যবহৃত সব জিনিস ফেলে দেওয়া হয়, তাই জাতক ঘরে মাটির বাসনপত্র ব্যবহার করা হয়। জাতক ঘরে কোন ব্যক্তি প্রবেশ করতে না পারলেও প্রয়োজন অনুযায়ী দাইমা (ধাত্রী) যেকোন সময় প্রবেশ করতে পারে। 

সনাতনী চর্চায় শিশু জন্মগ্রহণ করার পর তড়াই বাঁশের (বিশেষ প্রজাতির বাঁশ) চলটা (বাঁশের চেড়া ছাল বিশেষ) দিয়ে শিশুর নাই (নারী) কাটা হত। কিন্তু বর্তমানে ডালুরা নারী কাটার জন্য আগুনের আচে পোড়ানো ব্লে¬ড ব্যবহার করে থাকে। নারী কাটার পর গর্ভফুলের অংশটুকু যে পরিবারে সন্তান প্রসব করে সেই পরিবারের নিজেদের মালিকানাধীন জমির যে অংশে তুলনামূলকভাবে মানুষের আনাগোনা কম সেই স্থানে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে রাখা হয়। 

সনাতনী প্রথা অনুযায়ী, সন্তান প্রসবের পর সমাজের মানুষকে অবহিত করার জন্য পাঁচবার জোঁগাল (উলুধ্বনি) দেওয়া হয়। জোঁগাল দেওয়ার মাধ্যমে সমাজের মানুষ জানতে পারে যে, শিশু ভালোভাবে জন্মগ্রহণ করেছে। জোঁগাল দেয়ার প্রচলিত রীতিতে ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তানের ক্ষেত্রে অভিন্ন নিয়ম পালন করা হয়। এরপর ডালুরা শিশুর নামকরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে।

নামকরণ অনুষ্ঠান 
নবজাতকের নামকরণের সময়কাল প্রসঙ্গে ডালুদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে, যেমন-কারো মতে, শিশু জন্মের তিনমাস পর, আবার কারো মতে, জন্মের তিনদিন পর অথবা ছয়দিন পর শিশুর নামকরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। পক্ষান্তরে ডালুদের ‘মহিমার্ণব শ্রীযুক্ত ডালুবর্গের চৌদ্দ আনীর সালিসী’  নামক ১৩২৩ বঙ্গাব্দের একটি ধর্মীয় নিয়ম-নীতির সামাজিক দলিলে শিশু জন্মের তিন মাস পর শিশুর নামকরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করার নিয়ম উল্লেখ আছে (সূত্র: প্রাচীন সামাজিক দলিল)। নামকরণ অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজনের পরামর্শ নিয়ে সন্তানের মা-বাবা শিশু সন্তানের নাম নির্ধারণ করে। নামকরণ অনুষ্ঠানের দিন নবজাতকের চুল ও নখ কাটা হয়। নবজাতকের বাবা-মা তাদের পারিবারিক আর্থিক সামর্থ অনুসারে ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। 

জাতক্রিয়া
জাতক ঘরে থাকাকালীন সময়ে ডালু মা ও সন্তানকে অশুচি ভাবা হয়। অশৌচ অবস্থা থেকে শুচি অবস্থায় ফিরে আসার জন্য ডালুরা জাতক্রিয়া (শুচি করণ) অনুষ্ঠান পালন করে। সাধারণত অশৌচ পালনের পর জাতক ঘর পুড়িয়ে ফেলা হয়, অথবা নদীতে ফেলে দেয়া হয়। বর্তমানে ডালুদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় মা ও শিশুর জন্য আলাদা করে জাতক ঘর তৈরি করা হয় না। পরিবারের মূল ঘরের একটি অংশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে, সেখানে নবজাতক ও মায়ের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। জাতক্রিয়ার দিন জাতক ঘরসহ সম্পূর্ণ ঘর শুদ্ধ করার মাধ্যমে জাতক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ঘর-বাড়ি শুদ্ধ করার জন্য গরুর চোনা (মূত্র) ঘরসহ পুরো বাড়িতে ছিটিয়ে দেয়া হয়। আবার নবজাতক, মা ও পরিবারের সকল সদস্যকে শুদ্ধ করার জন্য একটি পাত্রে কিছু পরিমাণ পানি নেয়া হয়; এরপর ধাতব পদার্থ হিসেবে কিছু অংশ সোনা বা রূপা সাতবার ওই পানিতে ডুবানো হয় আবার উঠানো হয়। ওই পানিতে সাতটি পাকা ধান, সাতটি তুলসী পাতা দেয়া হয় এবং ওই পানির সামান্য কিছু অংশ হাতের তালুতে নিয়ে প্রথমে নবজাতক ও পরে ঠিক একই উপায়ে মায়ের মাথায় দেয়া হয়। এরপর পুরো ঘরে ওই জল ছিটিয়ে দেয়া হয়। জাতক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নবজাতক ও সন্তানকে সামাজিক দৃষ্টিতে শুদ্ধ মনে করা হয়। এই দিন শীল (ক্ষৌরকার) ক্ষুর (চুলকাটার জন্য ব্যবহৃত অন্ত্র বিশেষ) দিয়ে শিশুর চুল ও নখে স্পর্শ করে, ক্ষুর শিশুর চুল ও নখে স্পর্শ করানোর মাধ্যমে ওই শিশুর চুল ও নখ কাটা হয়েছে বলে ধরা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে শীল শিশুর চুল কামিয়ে  দেয় ও নখ কেটে ফেলে। এই দিন শীল শিশুর মায়ের হাত ও পায়ের নখও কেটে দিয়ে যায়। পাড়া প্রতিবেশী কেউ যদি দাবি করে তাহলে ওই পরিবারকে তাদের ও চুল, দাঁড়ি, নখ কাটানোর ব্যবস্থা করতে হয়। এই দিন বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয়। নবজাতকের বাবা-মা আর্থিক সংগতির উপর ভোজ অনুষ্ঠানের পরিধি কতটুকু বড় ও বৈচিত্র্যময় হবে সেটা নির্ভর করে। সাধারণত সমাজের সবাই এই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হয়ে থাকে। খাবারের আয়োজন যাই হোক না কেন সাধারণত সমাজের সবাই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে চেষ্টা করে। 

জাতক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ওই দিন নবজাতক ও মাকে জাতক ঘর থেকে মূল বসবাসের ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং গৃহে প্রবেশের পূর্বে নবজাতকের দিদিমা (নবজাতের পিতার মা), অন্যথায় দিদিমা সম্পর্কের কোন আত্মীয় ধান-দূর্বা ছিটিয়ে শিশু ও শিশুর মাকে বরণ করে নেয়। 

অন্নপ্রাশন 
বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শিশুর প্রাথমিক খাদ্য তালিকায় আমিষ জাতীয় খাদ্যসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য সংযুক্ত করতে হয়। অনেক সমাজব্যবস্থাতে পারিবারিকভাবে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি দিনে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ডালুরা এই অনুষ্ঠানকে অন্নপ্রাশন/ মুখেভাত বলে। ডালুদের ‘মহিমার্ণব শ্রীযুক্ত ডালুবর্গের চৌদ্দ আনীর সালিসী’তে উল্লেখ আছে যে, অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠান শিশুর ১১ মাস বয়সে আয়োজন করা হয়। 

ঐতিহ্যগতভাবে অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠানে সমাজের মানুষ নিমন্ত্রণ করা হত এবং তাদের জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হত। আমন্ত্রিত অতিথিরা শিশুর জন্য সামর্থ অনুযায়ী উপহার নিয়ে আসত। বর্তমানে পরিবারের দূর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে এই অনুষ্ঠান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পারবারিকভাবে আয়োজন করা হয়ে থাকে। ফলে উপহার প্রদানের প্রচলন শুধুমাত্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। 

প্রচলিত রীতি অনুযায়ী অন্নপ্রাশনের দিন অথবা আগের দিন নারায়ণ পূজা আয়োজন করা হয়। সনাতনী প্রথা অনুসারে নারায়ন পূজা অধিকারী (ডালুদের ধর্মীয় পূজা-পার্বণ পরিচালনা করার জন্য বিশেষ ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি) দ্বারা পরিচালিত হত। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে ডালুদের কোন অধিকারী না থাকায় হিন্দু ব্রাহ্মণ দ্বারা নারায়ণ পূজার ধর্মীয়ক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
          
কর্ণমন্ত্র/ কানে ফু 
শিশুর বয়স যখন ৫ বছর পূর্ণ হয় তখন গোস্বামী (বিশেষ ধর্মীয় জ্ঞান সম্পন্ন ধর্মীয় গুরু স্থানীয় ব্যক্তি) দ্বারা ধর্মীয় মন্ত্র দানের মাধ্যমে শিশুকে শুচিকরণ করার প্রথা ডালুদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। নির্দিষ্ট বয়সে শিশুর শুচিকরণ রীতিকে ডালুরা কর্ণমন্ত্র/কানে ফু বলে। কর্ণমন্ত্র গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত কোন শিশুকে প্রচলিত ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে অশুচি ভাবা হয়। কর্ণমন্ত্র গ্রহণ করার আগে একটি শিশু কোন ধরণের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মাঙ্গলিক ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারলেও প্রত্যক্ষ সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারে না। কর্ণমন্ত্র ছাড়া কোন ব্যক্তি ধর্মীয় পূজা-পার্বণ পরিচালনা করতে পারে না। সনাতনী প্রথায় গোস্বামী কর্ণমন্ত্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। বর্তমানে হিন্দু ব্রাহ্মণদের সাহায্যে কর্ণমন্ত্র অনুষ্ঠানের মাঙ্গলিক ক্রিয়া পরিচালনা করা হয়। প্রচলিত প্রথানুসারে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য কোন মাস ও দিন নির্দিষ্ট না থাকলেও সাধারণত সপ্তাহের বৃহস্পতি, শুক্র এবং সোমবারকে মঙ্গলসূচক দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কর্ণে মন্ত্র দানের দিন পরিবারিক জ্ঞাতি ও সমাজের মানুষকে নিমন্ত্রণ দেয়া হয়। ডালু সমাজের প্রত্যেকে ব্যক্তির জন্য কর্ণমন্ত্র গ্রহণ করা একটি আবশ্যিক রীতি। যদি কোন ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর কর্ণমন্ত্র ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে তাহলে ওই ব্যক্তির অশুচি অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে বলে ডালুরা বিশ্বাস করে। কর্ণমন্ত্র গ্রহণ করার মাধ্যমে একজন ডালু সন্তানের ধর্মীয় জীবনস্তরের মর্যাদাভিত্তিক উত্তরণ ঘটে এবং ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদার সূচক হিসেবে নতুন আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়। 

বয়ঃসন্ধিকাল ও প্রথাগত চর্চা 
ডালু সমাজ ব্যবস্থায় কোন নারীর শরীরে ঋতুচক্রের প্রভাব যেদিন প্রথম দেখা দেয় সেইদিন থেকে ওই নারীর বয়ঃপ্রাপ্তি ঘটেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। নারীদের এই শারীরিক পরিবর্তনকে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়ার জন্য কোন বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করে না। তথাপি প্রথম ঋতুচক্রের প্রভাব চলাকালীন সময় একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে নারীকে শুদ্ধ করা হয়। শুদ্ধ করার জন্য প্রথমে একটি পাত্রে কিছু পরিমাণ পানি নেয়া হয়; এরপর ধাতব পদার্থ হিসেবে কিছু অংশ সোনা বা রূপা সাতবার ওই পানিতে ডুবানো হয় আবার উঠানো হয়। ওই পানিতে সাতটি ধান, সাতটি তুলসী পাতা দেয়া হয় এবং ওই পানির সামান্য কিছু অংশ নারীর মাথায় ও সারা শরীরে ছিটিয়ে দেয়। এছাড়াও ঋতুচক্র চলাকালীন সময়ে ওই নারীর ব্যবহৃত সকল দ্রব্যাদিতে ওই পানি ছিটিয়ে শুদ্ধ করা। যতদুর জানা যায় বয়সন্ধিকাল শুরু হওয়ার পর পরিবারের তরফ থেকে ওই নারীর বিয়ের জন্য পাত্রের সন্ধান শুরু করা হত। অন্যদিকে ছেলেদের সাবালকত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে ডালুরা কোন ধরনের আচার-অনুষ্ঠান পালন করে না। 

বিয়ে ব্যবস্থায় ও আচার-অনুষ্ঠান 
বর্তমান সময়ে বিয়ের সার্বজনীন সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব নয়। কেননা বিয়ে সম্পর্কে ব্যক্তি পর্যায়ে ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দর্শনগত ভিন্নতা রয়েছে। এছাড়াও বিয়ের ক্ষেত্রে সময়কাল, ব্যক্তির ভৌগলিক অবস্থান, ধর্ম, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি, প্রচলিত বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান চর্চা প্রভৃতি সূচকের ভিত্তিতে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। তবে যতদূর জানা যায়, মানব সভ্যতার প্রথম দিকের সমাজব্যবস্থা ও সংস্কৃতিতে বিয়ে ব্যবস্থার প্রচলন ছিল না। সমাজ বিবর্তনের ধারায় একটি পর্যায়ে বিয়ে একটি সামাজিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থাতেই বিয়ে ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে প্রত্যেককে বিয়ে করতে হবে এ বিষয়টি সার্বজনীন নয়। বিয়ের মাধ্যমে একজন মানুষ সমাজে ও পরিবারে তার অবস্থান পরিবর্তন ঘটায়।  

পৃথিবীর অনেক ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতিতে স্বগোত্র বিয়ের প্রচলন আছে। কিন্তু যতদূর জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুযায়ী ডালু সমাজ ব্যবস্থায় অন্তর্গোত্র বিয়ে (বহফড়মধসু) নিষিদ্ধ ছিল এবং বহির্গোত্র বিয়ে (বীড়মধসু) প্রচলিত ছিল। কারণ ডালুরা বিশ্বাস করে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়াও সমাজে কল্পনাসূত্রে আবদ্ধ সমগোত্রের ভাই-বোন আপন ভাই-বোনের সমতুল্য। ডালু সমাজে একই গোত্রের ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিয়ে পাপ হিসেবে  গণ্য করা হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে ডালু মধ্যে সমগোত্রের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে। বিয়ের প্রচলিত সনাতনী রীতি পরিবর্তন করে নতুন করে সমগোত্র বিয়ের প্রচলন হওয়ার কারণ হিসাবে বিন্নিবাড়ী গ্রামের হরেণ ডালু বলেন, পোলা-মাইয়ার বিয়ে দিতে গেলে যদি নিজ গোত্র ছাড়া অন্য গোত্রে বিয়ের চিন্তা ভাবনা করি সেক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে নিজ গোত্রেই ডালুরা বিয়ে দিচ্ছে। 

ডালুদের সাংস্কৃতিক রীতি অনুযায়ী, কোন বিবাহযোগ্য ছেলে বা মেয়ে তার মায়ের ভাই ও বাবার বোনের ছেলে বা মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে, অর্থাৎ ঈৎড়ংং পড়ঁংরহ সধৎৎরধমব স্বীকৃত। আবার কোন বিবাহযোগ্য ছেলে বা মেয়ে তার মায়ের বোন ও বাবার ভাইয়ের ছেলে বা মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে না। অর্থাৎ ডালু সংস্কৃতির বিয়ের রীতিতে চধৎধষষবষ পড়ঁংরহ সধৎৎরধমব স্বীকৃত নয়। 

কোন নারীর স্বামী যদি মারা যায় তাহলে, কোন বিধবা নারী তার স্বামীর ভাইকে বিয়ে করার (ষবারৎধঃব) প্রথা ডালু সমাজে রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোন বিধবা নারী মৃত স্বামীর বড় ভাইকে বিয়ে করতে পারে না। তবে মৃত ব্যক্তির ছোট ভাই বিয়ের উপযুক্ত হলে এবং বিয়ের জন্য মৃতের ছোট ভাই ও মৃতের স্ত্রী উভয়ের যদি সম্মতি থাকে তাহলে বিয়ে সম্ভব। কিন্তু প্রথা থাকা সত্ত্বেও ডালু সমাজে সচরাচর এই ধরনের বিয়ের প্রচলন দেখা যায় না। একজন ডালু পুরুষ বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে একাধিক বিয়ে করতে পারে।   

সাধারণত সমাজের অনুমতি সাপেক্ষে পাত্র-পাত্রী পক্ষ বিয়ে ঠিক করে। সনাতনী সমাজিক নিয়ম লঙ্ঘন করে কেউ যদি বিয়ে করত তাহলে, সেই বিয়ে সামাজিকভাবে বৈধতার স্বীকৃতি পেত না; নিয়ম ভঙ্গকারী দম্পতিকে সমাজচ্যুত করা হত। এছাড়া সামাজিক নিয়ম ভঙ্গ করে বিয়ে করার পর যদি বর বা কনে পক্ষ সেই বিয়ে মেনে নেয় তাহলে সনাতনী নিয়মানুযায়ী ওই পরিবারকে সামাজিকভাবে একঘরে করা (সমাজচ্যুত করা) হত। তবে যদি ওই দম্পতি পুনরায় সমাজে ফিরে আসতে চায় তাহলে, সমাজ নির্ধারিত ২৫ টাকা জরিমানা ও ভোজের আয়োজন করে সমাজের মানুষকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানোর প্রচলন ছিল। নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থদন্ড ও খাবারের আয়োজনের ফলে সমাজ বিয়েকে বৈধতার স্বীকৃতি দিত এবং ওই দম্পতি পুনরায় সমাজে ফিরে আসত। জরিমানা হিসেবে নির্ধারিত অর্থদন্ড প্রদানের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে যে পক্ষ সামাজিক বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয় সেই পক্ষকে পূর্বে উল্লেখিত পরিমাণ টাকা অর্থদন্ড হিসেবে প্রদান করতে হত। এছাড়াও দোষী পক্ষকে ভোজের সকল ব্যয়ভার বহন করতে হত। বর্তমানে বিয়ের ক্ষেত্রে সনাতনী কিছু কিছু আইন প্রচলিত থাকলেও সামাজিক নিয়ম লঙ্ঘন করে বিয়ে করলেও ওই পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয় না এবং কোন প্রকার অর্থদন্ড প্রদান করতে হয় না। তবে সমাজে বিয়ের সনাতনী নিয়ম লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি ও পরিবারকে ভালো চোখে দেখা হয় না।

বিয়ের ক্ষেত্রে ডালুদের সনাতনী প্রথা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জেংচাম উল্লেখ করেন যে, প্রথম রজঃদর্শনের পূর্বে কোন ডালু মেয়ের বিয়ে হলে সেক্ষেত্রে প্রথম রজঃদর্শনের সময় বেশ কিছু সামাজিক আচার পালন করে। এক্ষেত্রে প্রথম রজঃদর্শন প্রাপ্ত বধুকে আলাদরে ঘরে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে তিনদিন রাখা হয়। এসময়ে বউয়ের জন্য কারও মুখদর্শন অথবা সংসারের কাজকর্ম করা কিংবা বাইর বের হওয়া নিষিদ্ধ। তিনদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর বউ শুদ্ধস্নান করে এবং বাইরে যাওয়ার অনুমতি পায়। বাইরে পদার্পন করে সে সর্বপ্রথম তার স্বামীর মুখদর্শন করে। স্বামী যদি এ সময়ে গৃহে অনুপস্থিত থাকে তবে গৃহে রক্ষিত স্বামীর প্রতিচ্ছবি দর্শন করে এবং তৎপরে সংসারের কজে হাত দেয় (২০০৭:৪১৬)। 

জেংচামের বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, ডালু সমাজে বাল্য বিয়ের প্রচলন ছিল, কেননা প্রথম রজঃদর্শনের পূর্বে কোন নারীর বিয়ে হলে সে বিয়ের জন্য অপ্রাপ্ত বয়স্ক। বর্তমানে ডালু সামাজে বাল্যবিয়ের প্রচলন অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। ডালুরা মনে করে অভিভাবক মহলে বাল্যবিয়ের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার বাল্যবিয়ে রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে তারা (ডালুরা) মনে করে।

সমাজিক রীতি অনুযায়ী বাংলা চৈত্র (মার্চ-এপ্রিল) ও পৌষ (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) মাসে ডালুরা বিয়ে করে না। এই দুইমাস ছাড়া অন্য যেকোন মাসে বিয়ের অনুষ্ঠান হতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলা মাঘ (জানুয়ারি-ফেব্র“য়ারি) ও ফাল্গুন (ফেব্র“য়ারি-মার্চ) মাসকে ডালুরা বিয়ের জন্য মঙ্গলসূচক মাস হিসেবে বিবেচনা করে। ডালুদের বিয়েতে কোন ধরণের লিখিত দলিল থাকে না। শুধুমাত্র পুরোহিতের কাছে সংরক্ষিত দৈব খাতায় বর-কনের নাম লেখা হয়। ডালুরা বিশ্বাস করে দৈব খাতায় নাম লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে বর-কনের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন সৃষ্টি হয়। তারা মনে করেন বিয়ে হচ্ছে বিনি সুতার বন্ধন এবং এই বন্ধন কোনদিন বিচ্ছেদ হবার নয়। কেবলমাত্র স্বামী অথবা স্ত্রীর মৃত্যুর মাধ্যমে এই বিনি সুতার বন্ধন ছিন্ন হতে পারে। ডালুদের বিয়ে বৈচিত্র্যময় মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি ও বিশ্বাসের সাথে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের পাশাপাশি ধর্মীয় দর্শনের সরাসরি যোগসূত্রতা রয়েছে। বিয়ের পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ডালুরা পাত্র-পাত্রীর বয়স, উপার্জনক্ষমতার বিষয়ে খুব বেশি গুরুত্ব না দিলেও বর্তমানে বিষয়গুলো বিশেষ বিবেচনা করা হয়। ডালুদের বিয়ের সামগ্রিক আচার-অনুষ্ঠান কয়েকটি পর্বে বিভক্ত, পর্বসমূহ নিম্নরূপ-

বৌজোড়া
বিয়ের পাত্র-পাত্রীর সন্ধান দেয়া ও পাত্র-পাত্রী সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য ডালু সমাজে একজন ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করত। ডালুরা এই ব্যক্তিকে বৌজোড়া বলত। যতদূর জানা যায়, বৌজোড়া কিছু অর্থ ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রীর বিনিময়ে বিয়ের পাত্র-পাত্রী সন্ধান করত। সাধারণত বিয়ের প্রস্তাব প্রথমে পাত্র পক্ষ থেকে পাত্রী পক্ষের কাছে আনা হয়। পাত্র পক্ষের হয়ে বৌজোড়া পাত্রী পক্ষের কাছে বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করত। পাত্রী পক্ষের কাছে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রস্তাব দেয়ার সময় যদি পাত্রের মা জীবিত থাকে তাহলে তিনি বৌজোড়ার সাথে করে পাত্রের বাড়িতে যায় এবং পাত্রী দেখে আসে। বর্তমানে ডালু সংস্কৃতিতে বিয়ের ক্ষেত্রে বৌজোড়ার ভূমিকা নেই বললেই চলে। কারণ ডালুদের জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে প্রায় প্রত্যেকটি ডালু পরিবারের মধ্যে আন্তঃপারিবারিক যোগাযোগ রয়েছে, ফলে সন্তান বিয়ে দেয়ার জন্য পরিবারের আত্মীয়-স্বজনরা প্রস্তাব উত্থাপন করে।   

কন্যাফুঁড়ানী (কনে দেখা) 
প্রাথমিকভাবে পাত্রপক্ষ যদি পাত্রী পছন্দ করে তাহলে উভয় পরিবারের সুবিধা অনুযায়ী একটি দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে পাত্রপক্ষ পাত্রী দেখতে পাত্রীর বাড়িতে যায়। এইদিন পাত্রপক্ষ থেকে পাত্রীপক্ষকে বিয়ের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেয়া হয়। পাত্রী দেখার পাশাপাশি ওইদিন বিয়ের অনুষ্ঠানে কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে এবং সম্ভাব্য ব্যয় পাত্রপক্ষ ও পাত্রীপক্ষকে কতটুকু অংশ বহন করবে সে বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা হয়। যতদূর জানা যায়, ঐতিহ্যগতভাবে এই ধরণের আলোচনার কোন প্রচলন না থাকলেও বর্তমানে ডালুদের অর্থনৈতিক দূরাবস্থার কারণে বিয়ের ব্যয়ভার বহনের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী পক্ষের অংশগ্রহণের অনুপাত নির্ধারণের জন্য এই রীতির প্রচলন হয়েছে। বিয়ের খরচ বহনের বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিয়ের যাবতীয় খরচ কনে পক্ষকে বহন করতে হয়। ডালুরা এই অনুষ্ঠানকে কন্যাফুঁড়ানী বলে। কন্যাফুঁড়ানী অনুষ্ঠানের সকল খরচ কনের বাবাকে বহন করতে হয়। কন্যাফুঁড়ানী অনুষ্ঠানে পাত্রপক্ষকে বাধ্যতামূলকভাবে কনের জন্য সোনার নাকফুল নিয়ে আসতে হয়। বর্তমানে ডালুদের অর্থনৈতিক দূরাবস্থার কারণে অনেক পরিবার সোনার নাকফুলের পরিবর্তে রূপার নাকফুল দিয়ে থাকে। ডালুরা সোনার নাকফুলকে নতুন বউয়ের জন্য মঙ্গলসূচক প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ ধাতু হিসেবে সোনাকে ডালুরা শুদ্ধতার প্রতীক মনে করে। কন্যাফুঁড়ানী অনুষ্ঠানের শেষাংশে ঐতিহ্যগত নিয়ম অনুসারে কন্যাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে পাত্রপক্ষের বয়োঃজৈষ্ঠ্য কোন ব্যক্তি আর্শীবাদ করে থাকে। এই নিয়ম পালনের জন্য সাধারণত পাত্রের জেঠা (বাবার বড় ভাই) বা কাকা (বাবার ছোট ভাই) অংশগ্রহণ করে। কোন ক্ষেত্রে যদি পাত্রের আপন জেঠা বা কাকা না থাকে তাহলে আত্মীয়সম্পর্কিত বয়োঃজৈষ্ঠ্য কোন পুরুষ ব্যক্তি এই দায়িত্বপালন করে। প্রচলিত নিয়মানুসারে কোন নারী এই দায়িত্ব পালন করতে পারে না। এই সম্পর্কে হাতিবান্ধা গ্রামের রাজমোহন ডালু বলেন, কনেকে আর্শীবাদ স্বরূপ টাকা প্রদানের রীতি বাধ্যতামূলক না হলেও ব্রিটিশ আমলে প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী কনেকে ২৫ টাকা এবং ১৯৭১ সালের পূর্বে ৫৯ টাকা দেয়ার রেওয়াজ ছিল। বর্তমানে কনেকে আর্শীবাদ স্বরূপ ১০১ টাকা দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। 

সাধারণত কন্যাফুঁড়ানী অনুষ্ঠানে পাত্রকে সঙ্গে নেওয়া হয় না। মূলত এই অনুষ্ঠানে পাত্র পক্ষের বয়োঃজৈষ্ঠ্য ব্যক্তিরা (নারী ও পুরুষ) অংশগ্রহণ করে। কিন্তু পাত্র যদি ইচ্ছা পোষণ করে তাহলে, কন্যাফুঁড়ানী অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর যেকোন সময় পাত্রীর সাথে দেখা করতে পারে।  


জামাই দেখা 
জামাই দেখা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার আরেকটি পর্ব। ডালুরা তাদের ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুসারে জামাই দেখা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এই অনুষ্ঠানে পাত্রীপক্ষের আত্মীয়-স্বজন ও সামাজের মানুষ পাত্র দেখতে পাত্রের বাড়িতে যায়। আবশ্যিক রীতি না হলেও পাত্রীপক্ষ থেকে ছেলেকে আর্শীবাদ স্বরূপ টাকা প্রদান করা হয়। রাজমোহন ডালু জানান, পাত্রী দেখার সময় আর্শীবাদস্বরূপ তাকে যে পরিমাণ টাকা দেওয়া হয়, পাত্র দেখার সময় ঠিক সেই একই পরিমাণ টাকা ছেলেকে দেওয়া হয়। অর্থ্যাৎ, ব্রিটিশ আমলে প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী, ২৫ টাকা, ১৯৭১ সালের পূর্বে ৫৯ টাকা এবং বর্তমানে ১০১ টাকা আর্শীবাদস্বরূপ দেওয়া হয়। 

পণরূপা
জামাই দেখা পর্ব শেষ হওয়ার পর মূল বিয়ের তারিখ ঠিক করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ছেলেপক্ষ কনেকে পণ দানের মাধ্যমে বিয়ে নিশ্চিত করে। ডালুরা বিয়ে পর্বের এই অংশকে পণরূপা নামে অভিহিত করে। যতদূর জানা যায়, সনাতনী প্রথা অনুসারে ডালুদের মধ্যে বিয়ের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে যৌতুক (ফড়ৎিু) প্রথার প্রচলন না থাকলেও, বর্তমান সময়ের কোন কোন বিয়েতে, পাত্রপক্ষের তরফ থেকে পাত্রের জন্য টাকাসহ বিভিন্ন দ্রব্য-সামগ্রী দাবি করার প্রচলন শুরু হয়েছে। কনেপণ ও যৌতুক প্রথা প্রসঙ্গে হাতিবান্ধা গ্রামের হরেণ ডালু বলেন-ব্রিটিশ আমলে কনেপণ হিসাবে ১২ টাকা দিতে হত। পাকিস্তান আমলে তা ৫৯ টাকায় এসে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কনেপণ প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে কনেপণের পরিবর্তে আমাদের মধ্যে আস্তে আস্তে ছেলেকে যৌতুক দেওয়ার প্রথা শুরু হয়েছে। যদিও ডালুরা এখনও যৌতুকের বাইরে থাকার চেষ্টা করছে।

পণরূপা অনুষ্ঠানে পাত্রের বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজন কনের বাড়িতে আসে। ডালুদের ঐতিহ্যগত নিয়ম অনুসারে এই অনুষ্ঠানে ছেলের পরিবার থেকে পান, সুপাড়ী, জর্দা নিয়ে আসে। এছাড়াও কনের জন্য শাড়ী, ব্লাউজ, পেটিকোট, সোনার নাকফুল, সিঁঁঁঁঁঁঁদুর, তেল ইত্যাদি নিয়ে আসতে হয়। পূর্বে এই অনুষ্ঠানে কনের জন্য পাথানি (ডালু নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক) আনা হত। কিন্তু বর্তমানে আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় এবং আগের ঐতিহ্যবাহী পোষাকের অপ্রতুল্যতার জন্য ডালুদের মধ্যে এই রীতির প্রচলন সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয় না। সনাতনী রীতি অনুযায়ী পণরূপাতে কনের জন্য কানপাশা, নোলক, নাকপাশা, বেকীখাড়–, ঠেংপাতা, গলায় দস্তা বা রূপার তৈরী মালা, টাকা ছড়া, সিকি ছড়াসহ বৈচিত্র্যময় অলংকার নিয়ে আসা হত। পারিবারিক আর্থিক সামর্থহীনতার কারণে এই সকল অলংকার প্রদানের প্রচলন আজ বিলুপ্ত। বর্তমান সময়ে যে সকল ডালু পরিবারের সামর্থ্য আছে সেই সব পরিবার পণরূপা অনুষ্ঠানে কনের জন্য বিভিন্ন ধরণের প্রসাধনী ও মিষ্টি নিয়ে আসে। পণরূপা অনুষ্ঠানের দিন ছেলেমেয়ে উভয় পক্ষের আত্মীয়স্বজন ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ব্রাহ্মণের সাহায্য নিয়ে বিয়ের দিন ও লগ্ন নির্ধারণ করা হয়। 

পণরূপার দিন ছেলের মা কনের মাথায় তেল ও সিঁথিতে সিঁদুর পড়িয়ে দেয়। ছেলের মা কনেকে তেল ও সিঁদুর পরানোর আগে কনে পাত্রপক্ষের থেকে নিয়ে আসা প্রসাধনীসামগ্রী ব্যবহার করতে পারে না। তেল-সিঁদুর পরিয়ে কনেকে বিয়ের জন্য পাকাপোক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে ডালুদের বিশ্বাস। স্থানীয়ভাবে ডালুদের অনেকেই পণরূপাকে তেলসিন্দুর অনুষ্ঠানও বলে থাকে। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ছেলের মা তেল সিঁদুর পরানোর দায়িত্ব পালন করে, কোন কারণে যদি ছেলের মা উপস্থিত না থাকে অথবা ছেলের মা যদি বিধবা হন সেক্ষেত্রে ছেলের জেঠী (পাত্রের বাবার বড় ভাইয়ের স্ত্রী), কিংবা কাকী (পাত্রের বাবার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী) অথবা বয়োঃজৈষ্ঠ্য কোন সধবা (স্বামী জীবিত আছে এমন নারী) নারী তেল-সিঁদুর পরানোর নিয়ম পালন করে। ডালুদের বিশ্বাস, যেদিন ছেলের মা কনেকে তেল-সিঁদুর পরিয়ে দেয় সেইদিন থেকে কনে আনুষ্ঠানিকভাবে ছেলে পক্ষের হয়ে যায়। সনাতনী রীতিমতে, কনেকে তেল-সিঁদুর পরানোর পর যদি কোন কারণে বিয়ে ভেঙ্গে যেত, তাহলে ওই নারীকে সামাজিক দৃষ্টিতে বিধবা মনে করা হত এবং তাকে পুনরায় বিয়ে দেয়ার আগে হাঙ্গা বিয়ে (ডালু সমাজে প্রচলিত বিশেষ ধরনের বিয়ের রীতি) দেয়া হত। বর্তমান সময়ে পণরূপার পর বিয়ে ভেঙ্গে গেলে কোন নারীকে হাঙ্গা বিয়ে দেয়ার প্রচলন নেই। 
যত দূর জানা যায়, যে সকল ডালু পরিবার আর্থিক দিক থেকে অবস্থাসম্পন্ন ছিল তারা মূল বিয়ে অনুষ্ঠানের এক মাস পূর্বে পণরূপা বা তেল-সিঁদুর অনুষ্ঠান করত। তবে বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মূল বিয়ে অনুষ্ঠানের ৫/৭ অথবা ১০/১৫ দিন পূর্বে পণরূপা অনুষ্ঠান করা হয়। পণরূপা অনুষ্ঠানে শেষ হওয়ার পর থেকে বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কনেকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না এবং মূল বিয়ে অনুষ্ঠানের আগে বর-কনে পরস্পরের সাথে দেখা করতে পারে না।

চড়া জল সংগ্রহ ও অধিবাস  
মূল বিয়ের আগের দিনের রাত ১২টার পর থেকে শুরু করে প্রথম দিনের বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর-কনে উভয়কে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে উপবাস করে। অধিবাসের দিন সকাল বেলা বর-কনেকে স্নান করানোর জন্য তাদের নিজ নিজ বাড়িতে চড়া জল সংগ্রহ করে স্নান সম্পন্ন করানো হয়। কনেকে স্নান করানোর জন্য কনের বাড়িতে নির্ধারিত আইড়োরা (বিয়ের মাঙ্গলিক ক্রিয়া পরিচালনার জন্য সহায়ক হিসেবে নির্ধারিত নারী) চড়া জল সংগ্রহ করে এবং বরকে স্নান করানোর জন্য বরের বাড়িতে ধর্ম বাবা/মা চড়া জল সংগ্রহ করে থাকে। চড়া জল সংগ্রহ হয়ে গেলে কনের বাড়ির উঠানে একটি বর্গাকার পুকুর বানানো হয়। পুকুরের চারপাশে চারটি বাঁশের কঞ্চি পুঁতে মূল বিয়ের আদলে কুঞ্জ বানানো হয়। কুঞ্জের পশ্চিম পাশে পূর্ব দিকে মুখ করে কনেকে বসিয়ে স্নান সম্পন্ন করা হয়। ঠিক একই রীতি অনুসরণ করে বরের বাড়িতে বরকেও স্নান করানো হয়। স্নান শেষে বিয়ের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরে বর তার নিজ বাড়ি থেকে কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। 

বর ও কনেকে বিয়ের দিন একসাথে কনের বাড়িতে স্নান করানো হয়। তাই বর কনের বাড়িতে চলে এলে পুনরায় আইড়োরা চড়াজল সংগ্রহ করে। বিয়ের জন্য নির্ধারিত ধর্ম বাপ (নিজের পিতা নয়, কিন্তু বিয়ের জন্য নির্ধারিত এমন একজন ব্যক্তি যাকে পিতা হিসেব গণ্য করা হয়) অথবা ধর্ম মা (নিজের মা নয়, কিন্তু বিয়ের জন্য নির্ধারিত এমন একজন ব্যক্তি যাকে মা হিসেব গণ্য করা হয়)কে সঙ্গে নিয়ে চড়াজল সংগ্রহের জন্য পুকুর অথবা নদীতে যায়। এই সময়ে ধর্ম মা অথবা ধর্ম বাবার সাথে ৯ জন আইড়ো ও ঢুলীর দল (বাদ্যযন্ত্রের দল) সঙ্গে থাকে। প্রথমে জল সংগ্রহ করার উৎসস্থলে জলের নিকটবর্তী ভূমিতে বর্গাকারে চারদিকে ৪টি বাঁশের কঞ্চি (বাঁশের চিকন ডাল বিশেষ) দিয়ে মূল বিয়ের কুঞ্জের আদলে কুঞ্জ বানানো হয়। কুঞ্জের মাঝে একটি ঘটে (মাটির তৈরি বিশেষ পাত্র) আমপাতার পল্লব, নতুন গামছা, জাতকলা (স্বল্প সংখ্যক বিচি যুক্ত কলা), যদি জাতকলা না পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে চাপাকলা দেয়া হয়। আইড়োদের হাতে যে ৫টি ঘট থাকে সেগুলোতে শুধুমাত্র আমপাতার পল্লব ও মুছি থাকে। ধর্ম বাপ অথবা মা জলে নেমে দুই হাতে দুটো ঘট নিয়ে ডান হাত বাম দিকে বাম হাত ডান দিকে নিয়ে এক ডুবে স্নান শেষ করে দুই ঘটে জলভরে নিয়ে আসে। ঠিক একই সময়ে ৯ জন আইড়ো অন্য ঘটগুলোতে জল সংগ্রহ করে।  

বাড়ি থেকে চড়াজল সংগ্রহ করে ফিরে আসার সময় কম বয়সী ছেলে-মেয়ে, আইড়ো, ধর্ম বাপ অথবা মা বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচে-গেয়ে আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করে। চড়াজল সংগ্রহ করে নিয়ে আসার পরে বাড়ির উঠানে সুবিধামত জায়গায় মাটি খুঁড়ে চারকোনা একটি পুকুর তৈরি করা হয় এবং পুকুরের চারপাশে চারটি বাঁশের কঞ্চি পুঁতে কুঞ্জ তৈরি করা হয়। উল্লেখ্য যে, ডালু সমাজের বিয়ের সব কুঞ্জেই সাদা রঙের গুটির সূতা দ্বারা সাতটি পাক দিয়ে বন্ধনী দেয়া থাকে। তৈরিকৃত কুঞ্জের পাশে একটি পিড়িতে বর-কনেকে এক সাথে বাসানো হয় এবং একটি কাপড় দিয়ে স্নানের স্থানটি ঘিরে রাখে। ধর্ম বাপ অথবা মায়ের সংগ্রহ করা দুই ঘট জল/ চড়াজল বর দুই হাতে তুলে নেয়, এরপর বর তার ডান হাত বাম দিকে এবং বাম হাত ডান দিকে নিয়ে এক ঘট জল নিজের গায়ে অন্য ঘট জল কনের গায়ে ঢেলে দেয় (কনে বরের বাম দিকে অবস্থান করে এবং বর-কনেকে পূর্ব দিকে মুখ করে দাঁড় করানো হয়)। পরে আইড়োরা তাদের সংগ্রহ করা ঘটের জল দিয়ে বর-কনের স্নান সম্পূর্ণ করায়। যে স্থানে স্নান করানো হয় সেখানে থেকে বরকে তার বোন জামাই অথবা ক্ষেত্র বিশেষ ধর্ম বাপ/মা কোলে তুলে ঘরে নিয়ে আসে। আসার সময় বরের সমানে মাটিতে রাখা মুছি বাম পা দিয়ে ভেঙ্গে আসতে হয়। ঠিক একই সাথে কনেকে তার দিদিমা অথবা মামী কোলে করে ঘরে নিয়ে আসে। উল্লেখ্য যে, স্নানের পর প্রথমে বর এবং পরে কনেকে ঘরে নিয়ে আসা হয়।

ডালুদের মধ্যে মূলত গায়ে হলুদ দেয়ার জন্য আলাদা কোন অনুষ্ঠান হয় না। অধিবাসের দিন রাত্রিতে বর এবং কনেকে ঘরের মেঝেতে পূর্ব পাশের দেওয়ালের দিকে মুখ করে বাসানো হয়। পূর্ব দিকের দেওয়ালে কদম ফুল, পালকি, চাঁদ ও সূর্য্যরে ছবি আঁকা হয়। এইগুলো আঁকার জন্য আতপ চালের গুড়া দিয়ে তৈরি তরল মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। পূর্ব দিকের দেওয়ালে আঁকা কদম ফুল কৃষ্ণের কদম ফুলের প্রতীক, চাঁদ, সূর্য্য ভবিষ্যতে নবদম্পতির বিবাহিত জীবনকে আলোকিত করবে বলে ডালুরা বিশ্বাস করে। স্নানের পূর্বে আইড়োরা (বিয়ের মাঙ্গলিক ক্রিয়া পরিচালনা করার জন্য নির্ধারিত সধবা নারীবৃন্দ) কাঁচা হলুদ, মেথি ও কালোজিরা একসাথে বেটে সরিষার তেলের সাথে মিশিয়ে বর এবং কনের গায়ে মেখে দেয়া হয়। অধিবাসের সময় সীলপাটার (মসলা পেষণের হাত যন্ত্র বিশেষ) গন্ধ শুকার জন্য বর ও কনের নাকের সামনে সাতবার সীলপাটা ধরা হয়, ডালুরা এই চর্চাকে গণছোয়া বলে। ডালুরা বিশ্বাস করে যে, গণছোয়া চর্চা পালনের মাধ্যমে বর ও কনেকে পূর্বাভাস দেওয়া হয় যে, তারা (বর-কনে) নতুন সংসার শুরু করতে যাচ্ছে। কুঞ্জে ভরা বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই পূর্বে উল্লেখিত আচারানুষ্ঠানগুলো সম্পন্ন করতে হয়। 
কুঞ্জসজ্জা 
বিয়ের লগ্ন শুরুর পূর্বে বিয়ের মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য নির্ধারিত স্থান কনের পরিবারের সমার্থ ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক বিধান অনুযায়ী সুসজ্জিত করা হয়। ডালুরা বিয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানকে কুঞ্জ বলে। কুঞ্জ তৈরির ক্ষেত্রে ডালুরা কিছু নিয়ম-নীতি পালন করে। কুঞ্জসজ্জার জন্য আবশ্যিকভাবে যে সব জিনিসের প্রয়োজন হয় তা হল-
ক্স প্রায় সমান মাপের চারটি কলা গাছ
ক্স চারটি বাঁশের কঞ্চি (বাঁশের ডাল-পালা বিশেষ)
ক্স ১৬টি মাটির তৈরি ঘট
ক্স ১৬টি মাটির তৈরি মুছি
ক্স প্রয়োজন আনুসারে পাকা ধান 
ক্স প্রয়োজন আনুসারে আতপ চালের গুড়া 
ক্স সাদা মার্কিন কাপড় 
ক্স মার্বেল আকৃতির মাটির তৈরি গুটি
ক্স সাতপাকে বাঁধার জন্য সাত নলা সাদা রঙের গুটির সুতা  

যে বাড়িতে বিয়ের মাঙ্গলিক ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে কুঞ্জ সবসময় সেই বাড়ির উঠানে তৈরি করা হয়। কুঞ্জের ভূমি অংশের চার কোনায় চারটি গর্ত করে চারটি কলাগাছ সমান দূরত্বে এমনভাবে বসানো হয় যাতে করে কলাগাছের অধিকাংশ অংশ মাটির উপরের অংশে থাকে এবং কলাগাছও যেন হেলে না পরে। কলাগাছ বসানোর ক্ষেত্রে বর দাঁড়িয়ে তার দুই বাহু প্রসারিত করলে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় সেই পরিমাপ ব্যবহার করা হয়। মাটির চারটি গর্তে কলাগাছ বসানোর পূর্বেই প্রতিটি গর্তে একটি করে পান এবং পানের উপরে একটি খোলসসহ সুপারি দেওয়া হয়। ডালুরা বিয়ের আচার-অনুষ্ঠানে পানকে মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। এরপর চারটি গর্তের মধ্যে বাম দিকের যেকোন একটি গর্তের পাশে বরকে দাঁড় করিয়ে বরের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি কলাগাছ বসানো হয় এবং অন্য তিনটি কলাগাছ কনের যেকোন আত্মীয় বা সমাজের যেকোন তিনজন পুরুষ ব্যক্তির সাহায্যে গর্তে বসিয়ে দেয়া হয়। এরপর কলাগাছের সাথে চার কোণায় চারটি বাঁশের কঞ্চি এমনভাবে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয় যাতে করে কঞ্চির বেশির ভাগ অংশ মাটির উপরিভাগে থাকে। তিনটি কঞ্চি গর্তে বসানোর দায়িত্ব পালন করে কনের যেকোন আত্মীয় বা সমাজের যেকোন তিনজন পুরুষ ব্যক্তির এবং অপর একটি কঞ্চি বরের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে গর্তে বসানো হয়। এরপর বাড়ির ছেলেরা রঙিন কাগজ দিয়ে বিভিন্ন নঁকশা কেটে কুঞ্জ সাজায়। কুঞ্জ সজ্জার কিছু কিছু কাজ বিয়ের জন্য নির্ধারিত আইড়োরা করে থাকে। আইড়োরা প্রথমে সম্পূর্ণ কুঞ্জের ভূমির অংশটুকু মাটি ও জল মিশ্রিত মিশ্রণ দিয়ে লেপে (প্রলেপ) দেয়। মাটির প্রলেপ শুকিয়ে যাওয়ার পর আতপ (চাল তৈরির পূর্বে যে ধান সিদ্ধ করা হয় না) চালের গুঁড়া দিয়ে সম্পূর্ণ কুঁঞ্জের মাটির অংশে আলপনা আঁকা হয়। আলপনায় অংকিত বিভিন্ন নঁকশার মাঝে মাঝে বগ (পুরুষ বক পাখি) ও বগির (নারী বক পাখি) চিত্র আঁকা হয়। এছাড়াও আলপনার মাঝে মাঝে ১৬টি স্থানে একমুঠো পরিমাণ পাকা ধান দেয়া হয়। ধানের ওপরে কুঞ্জের পূর্ব দিকের অংশে ষোলটি মাটির ঘট বসানো হয় এবং ওই ঘটগুলোর ওপরে ষোলটি মাটির প্রজ্জলিত মুছি (প্রদীপ বিশেষ) দিয়ে সাজানো হয়। কুঞ্জের ওপরের অংশে সাদা মার্কিন কাপড় ছাউনির মত করে টানানো হয়। সাদা কাপড়ের ছাউনির মাঝখানে চারটি জাতকলা (বিশেষ প্রজাতির কলা), আমপাতার পল্লব, একটা মাটির মুছি ও সাতটি মাটির গুটি একসাথে করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পূর্বে নির্ধারিত লগ্নে কুঞ্জে বিয়ের মূল মাঙ্গলিক ক্রিয়া শুরু হয়।

কুঞ্জে বিয়ে 
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা যে স্থানে সম্পন্ন হয় সেই স্থানকে কুঞ্জ বলা হয়। তাই বিয়ের মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানকে ডালুরা কুঞ্জে বিয়ে বলে। কুঞ্জে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সাধারণত দুইটি পর্বে সম্পন্ন হয়ে থাকে, যেমন- 
ক্স ভরা বিয়ে
ক্স বাসী বিয়ে
পণরূপা অনুষ্ঠানের দিন পুরোহিতের সাহায্য নিয়ে বিয়ের লগ্ন নির্ধারণ করা হয়। ধর্মীয় মতে, বিয়ের দিন পূর্বে নির্ধারিত লগ্নকাল শেষ হওয়ার পূর্বেই মূল বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করতে হয়। রাজমোহন ডালু বলেন, ১৯৭১ সালের পূর্বে ডালুদের নিজস্ব ধর্মীয় প্রধান দ্বারা বিয়ের যাবতীয় মাঙ্গলিক ক্রিয়া পরিচালনা করা হত। ডালুরা ধর্মীয় প্রধানকে অধিকারী নামে সম্বোধন করত। কিন্তু বর্তমান সময়ে ডালুদের নিজস্ব কোন অধিকারী নেই। ডালু সমাজের সর্বশেষ অধিকারী ছিলেন নলীত অধিকারী। ১৯৭১ সালে নলীত অধিকারী ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে ডালুরা হিন্দু ব্রাহ্মণ দ্বারা বিয়ের অনুষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে। 

সনাতনী রীতি অনুযায়ী প্রতিটি ডালু পরিবার অধিকারীকে বাৎসরিক চুক্তিতে অর্থ প্রদান করত, বিনিময়ে অধিকারী প্রতিটি ডালু পরিবারের প্রয়োজন মোতাবেক উপস্থিত হয়ে মাঙ্গলিক ক্রিয়া সম্পাদন করত। কিন্তু বর্তমানে বিয়ের মাঙ্গলিক কাজ পরিচালনার জন্য হিন্দু পুরোহিতকে পারিশ্রমিক হিসেবে একটি গামছা, একটি ধুতি, চাল দিতে হয়। এছাড়াও বিয়েতে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত বিভিন্ন সামগ্রী পুরোহিতের প্রাপ্য। কোন কোন ক্ষেত্রে পুরোহিত বিবাহিত হলে তার (পুরোহিত) স্ত্রীর জন্য ১টি শাড়ি দাবি করে থাকে। এছাড়াও পরিবারের সামর্থ অনুযায়ী পুরোহিতকে নগদ টাকা দেয়া হয়। পুরোহিতকে প্রদান করা নগদ অর্থকে ডালুরা দক্ষিণা বলে। 

ভরা বিয়ের মূল কার্যক্রম শুরু হয় যজ্ঞের মাধ্যমে। তবে পুরোহিত বিয়ের যজ্ঞ অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বেই কনের জন্মসূত্রে পাওয়া গোত্রনাম পরিবর্তন করে স্বামীর গোত্রনাম অনুসারে গোত্রান্তর করে এবং তার (পুরোহিত) কাছে থাকা দৈব খাতায় লিখে রাখে। ডালুদের বিশ্বাস করে, দৈবখাতায় বর-কনের নাম ও পরিবর্তীত গোত্র পরিচয় লেখা হলে দেবতার খাতায় কনের পরিবর্তীত গোত্রনাম লেখা হয়ে যায়। যেহেতু ডালুদের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি অনুসারে বিয়ে সম্পকির্ত কোন দলিল লেখা হয় না, তাই ডালুরা দৈব খাতাকে বিয়ের দলিল হিসেবে বিশ্বাস করে। যজ্ঞ শেষ হলে বর-কনেকে কুঞ্জের পশ্চিম পাশে পূর্বদিকে মুখ করে আসন (কাঠের তৈরি পিড়ি) পেতে বসানো হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বরের বাম পাশে কনেকে বসানো হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে ডালুরা বিশ্বাস করে, নারীরা পুরুষের বাম হাতের নিচের অংশের বুকের হাঁড় দিয়ে তৈরি। তাই নারীকে পুরুষের বাম পাশে রাখা হয়। ভরা বিয়ে প্রধানত তিনটি পর্বে হয়ে থাকে, যেমন-
    
মালা বদল পর্ব > দান পর্ব > সাতনলার পাক পর্ব

কুঞ্জের পশ্চিম দিকে বর-কনেকে একে অপরের সামনে দাঁড় করিয়ে মালা বদল ক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। মালা বদল পর্বে প্রথমে কনে বরকে দুই হাত দিয়ে মালা পরিয়ে দেয়। কিন্তু বর সেই মালা বাম হাত দিয়ে খুলে পুনরায় কনেকে পরিয়ে দেয়। একই কৌশল অবলম্বন করে পরপর ছয়বার বর-কনে মধ্যে মালা বদল করা হয়। কিন্তু সপ্তমবারে বর দুই হাত দিয়ে কনেকে মালা পরিয়ে দেয়। ডালুরা বিশ্বাস করে মালা বদলের পর বর-কনের বন্ধন দৃঢ় হয়। মালাবদলের জন্য সাধারণত প্রাকৃতিক অথবা কাগজের তৈরি ফুলের মালা ব্যবহার কর হয়। মালা বদল পর্ব শেষ হওয়ার পর শুরু হয় দান পর্ব।

দান পর্বে বর কাঠের পিঁড়ির ওপরে বসে থাকে এবং কনে দাঁড়ানো অবস্থায় বরের মাথায় সাতবার বাঁশের কুলা স্পর্শ করে, এ সময়ে কুলায় ফুল (যেকোন ফুল হতে পারে), পাকা ধান, দূর্বা থাকে। প্রতিবার কুলা স্পর্শ করার সময় কনে কুলায় থাকা ধান, দূর্বা ও ফুলের কিছু অংশ বরের উদ্দেশ্যে ছিটিয়ে দেয়। এই কাজে আইড়োরা কনেকে সহযোগিতা করে। ডালুরা ফুল ছিটানোর চর্চা দ্বারা বিশ্বাস করে যে, কনে তার বরের জীবনে ফুলের মত সুখ নিয়ে আসবে। ধান ও দূর্বা ছিটানোর মাধ্যমে কনে বরকে জানিয়ে দেয় যে, স্বামীর সমস্ত সম্পদ কনে নিজের কাছে সংরক্ষিত রাখবে এবং সংরক্ষিত সম্পদ অপরের জন্য ব্যয় না করে শুধুমাত্র স্বামীর জন্য ব্যয় করবে। দান পর্ব শেষ হতেই শুরু হয় সাতনলার পাক।  

সাতনলার পাক পর্ব সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে ডালুরা বিশ্বাস করে যে, বিয়ে পরবর্তী সময় থেকে আমৃত্যু পর্যন্ত বর ও কনে পরস্পরের সাথে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। কুঞ্জের বাইরে দিয়ে কুঞ্জের চারদিকে সাতবার প্রদক্ষিণ করার মাধ্যমে সাতনলার পাক সম্পন্ন হয়। কুঞ্জ সজ্জার সময় আইড়োরা কুঞ্জের পূর্বদিকে সাতটি কলার ডুঙ্গা (কলাগাছের বাকল দিয়ে তৈরি পাত্র বিশেষ) দিয়ে সাজিয়ে রাখে। ধান, দূর্বা, সিঁদুরের ফোটা দিয়ে প্রতিটি ডুঙ্গা সাজানো হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ডুঙ্গার ডান পাশে ৪টি ও বাম দিকে ৩টি সিঁদুরের ফোটা দেয়ার রীতি রয়েছে। সাতনলার পর্বে সাতবার কুঞ্জ প্রদক্ষিণ করার ক্ষেত্রে প্রথম তিনবার প্রদক্ষিণকালে সবার প্রথমে পুরোহিত, এরপর কনে, তারপর বর, আইড়ো এবং সবশেষে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ এই ধারাবাহিকতায় সবাই একসাথে তিনবার কুঞ্জ প্রদক্ষিণ করে। প্রথমবার যে দিকে থেকে তিনপাক সম্পন্ন হবে, দ্বিতীয়বার তার বিপরীত দিক থেকে বাকি চারপাক সম্পন্ন করা হয়। দ্বিতীয়বারের ক্ষেত্রে প্রথমে পুরোহিত, তারপর বর, বরের পরে কনে, আইড়ো এবং সর্বশেষে অতিথিবৃন্দ এই ক্রমানুসারে সবাই সমবেত হয়ে কুঞ্জ প্রদক্ষিণ করে থাকে। সবাই সমবেত হয়ে সাতপাক ঘোরার ক্ষেত্রে ডালুদের ব্যাখ্যা হচ্ছে, সাতনলা পাকের স্বাক্ষী হিসেবে সবাই বর-কনের সঙ্গে একসাথে সাতনলার পাকে অংশগ্রহণ করে। 

ভরা বিয়ে চলাকালীন সময়ে মিতা (বিয়ের অনুষ্ঠানে বরকে সহায়তা করার জন্য বরের বন্ধু স্থানীয় ব্যক্তি) কুঞ্জের পূর্ব পাশের বাম কোনের কলাগাছ পেছনে রেখে চালন (বাঁশের তৈরি ছিদ্র যুক্ত পাত্র বিশেষ) কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মিতার কাঁধে থাকা চালনে চাল, ডাল, কলা, চিনি ও দই এই পাঁচটি দ্রব্য রাখা হয়, ডালুরা এই পাঁচটি দ্রব্যকে একসাথে পঞ্চসামগ্রী বলে। এছাড়াও এই সময়ে আবশ্যিকভাবে মিতার যেকোন হাতে একটি ঘটে জল, একটি গামছা, এক কান্দা (সম্পূর্ণ কলার ছড়ায় যে ভাগ থাকে তার একটি ভাগ) কলা থাকতে হয়। প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী নিয়ম অনুসারে কলা নেয়ার সময় যদি কান্দা থেকে কোন একটি কলা ছিড়ে নেওয়া হয় কিংবা প্রাকৃতিক উপায়ে (নিজ থেকে) পরে যায়, তাহলে সেই কলা ফেলে দিয়ে নতুন করে এক কান্দা কলা নেয়া হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ডালুরা জাতকলা (যে কলার ভেতরে স্বল্প সংখ্যক বিচি থাকে) ব্যবহার করে থাকে। ক্ষেত্র বিশেষ যদি জাতকলা না পাওয়া গেলে চাপা কলা ব্যবহার করা হয়। মিতার হাতে থাকা ঘটের জল দিয়ে ভরা বিয়ের সব মাঙ্গলিক কার্যক্রম শেষ করা হয় এবং একই জল দিয়ে পরের দিন বাসী বিয়ের মাঙ্গলিক ক্রিয়া সম্পাদন করা হয়। সাতপাকের বন্ধন শেষ হওয়ার পর মিতা পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলেন- এখানে কি হচ্ছে ? প্রতি উত্তরে উপস্থিত সবাই বলে, এখানে তোমার মিতার বিয়ে হচ্ছে। মিতা আবার বলে যে, আমি সেটা শুনেই এসেছি। এরপর উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে মিতা বলে, বিয়ার শব্দ শুইন্যা, উত্তম গাঙ্গের জল নিয়া আসছি। সাতনলার পাক হয়ে গেলে বর-কনেকে ভরা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে যায়। ভরা বিয়ে শেষ হয়ে গেলে বর-কনেকে বিশ্রাম দেয়ার জন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন সকালে বাসী বিয়ে শুরু হয়।

ভরা বিয়ে শেষ হওয়ার পরের দিন সকালে বাসী বিয়ের আয়োজন করা হয়। সাধারণত সূর্য্য পূর্ণাঙ্গ আকারে উদিত হওয়ার পূর্বেই বাসী বিয়ে সম্পন্ন করার নিয়ম রয়েছে। বাসী বিয়ের আগে বর ও কনেকে ভরা বিয়ের দিন সংগ্রহ করা চড়া জল দিয়ে স্নান করানো হয়। বাসী বিয়ের অনুষ্ঠান কুঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়। পুরোহিত এই বিয়ে পরিচালনা করে থাকেন। যদি কোন কারণে পুরোহিত বাসী বিয়েতে উপস্থিত না থাকতে পারে সেক্ষেত্রে আইড়োরা বাসী বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে। বর-কনেকে কুঞ্জের পশ্চিম পাশে পূর্বদিকে মুখ করে আসন (কাঠের তৈরি পিঁড়ি) পেতে বসানো হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বরের বাম পাশে কনেকে বসানো হয়। এ সময়ে  বর-কনের সামনে চালনে পাকা ধান, দূর্বা ও একটি মুছিতে খাছ (সরিষার) তেল থাকে। এরপর পর্যায়ক্রমে নয়জন আইড়ো বর-কনের উদ্দেশ্যে ধান-দূর্বা ছিটিয়ে দেয় এবং উলুধ্বনি দেয়। 

বাসী বিয়ের দিন আগত বয়োঃজৈষ্ঠ্য অতিথিরা বর-কনেকে আর্শীবাদ করে এবং আর্শীবাদস্বরূপ প্রত্যেকেই সাধ্যমত টাকা ও অন্যান্য দ্রব্য-সামগ্রী দিয়ে থাকে। ডালুরা বিশ্বাস করে যে, যদি গাঁও মোড়ল (ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব ক্ষমতা কাঠামোর প্রধান ব্যক্তি) নবদম্পতিকে আর্শীবাদ না করে, তাহলে সমাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ওই বিয়ে শুদ্ধ হয় না। বর্তমানে নিজস্ব ক্ষমতা কাঠামো যেহেতু বিলুপ্ত হওয়ার ফলে সামজের বয়োঃজৈষ্ঠ ব্যক্তিদের আর্শীবাদের মাধ্যমে সামাজিকভাবে বিয়ে বৈধ করা হয়। বাসী বিয়ের দিন কনের বাড়িতে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য ভোজের আয়োজন করা হয়।

বাসী বিয়ে শেষ হওয়ার পর ধর্ম মা অথবা ধর্মবাবা যে বাড়িতে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় সেই পরিবারের মূল থাকার ঘরের দরজায় বাইরের দিক মুখ করে বসে, এরপর তার ডান পায়ের ওপরে বরকে ও বাম পায়ে কনেকে বসিয়ে মিষ্টিদ্রব্য খাওয়ায়। ধর্ম বাবা অথবা ধর্ম মা প্রথমবার বর ও কনের মুখে যে মিষ্টি তুলে দেয় এবং বর-কনে উভয়ে ওই মিষ্টি ফেলে দেয়। ধর্ম বাবা অথবা ধর্ম মা যতক্ষণ না পর্যন্ত বর-কনের মধ্য থেকে যেকোন একজনকে নিজের ছেলে অথবা মেয়ে হিসাবে গ্রহণ না করবে ততক্ষণ বর-কনে তার (ধর্ম বাবা, মা) দেয়া মিষ্টি খায় না। এভাবে তিনবার মুখ থেকে মিষ্টি ফেলে দেওয়ার পরে চতুর্থবার বর-কনে মিষ্টি গ্রহণ করে। মিষ্টি খাবার পূর্বেই ধর্ম বাবা অথবা ধর্ম মা বর-কনের মধ্য থেকে যেকোন একজনকে তার মেয়ে অথবা ছেলে হিসাবে গ্রহণ করে। যেহেতু ধর্ম বাবা অথবা ধর্ম মা বরের দিকের আত্মীয়রা হয়ে থাকে তাই বেশির ভাগ সময় কনেকে মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। 

বাসী বিয়ের এই পর্ব শেষ হওয়ার পর বরের বাড়ির সকল আত্মীয়স্বজন বর-কনেকে নিয়ে বরের বাড়ির উদ্দেশ্য যাত্রা করে। বরের বাড়িতে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে কনে প্রথম দিন গিয়ে যাতে করে কোন ধরণের সংকোচবোধ না করে সেই জন্য কনের সাথে দিদিমা সম্পর্কের বয়োঃজৈষ্ঠ্য কোন নারী অথবা কনের ছোট ভাই-বোন বরের বাড়িতে যায়। স্থানীয়ভাবে এদেরকে দাওরালী নামে ডাকা হয়।  

বৌভাত 
বৌভাতের অনুষ্ঠান বরের বাড়িতে সম্পন্ন হয়। বাসী বিয়ে শেষ করে কনেকে নিয়ে বরপক্ষ বরের বাড়িতে চলে আসে এবং পরের দিন বরের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন ও সমাজস্থ মানুষের উদ্দেশ্যে ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, এই ভোজ আনুষ্ঠানকে বৌভাত বলা হয়ে থাকে। বৌভাত অনুষ্ঠানে বরের পরিবারের সামর্থ অনুযায়ী সমাজের লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনদের নিমন্ত্রণ করা হয়। এই দিন খাবার খাওয়া ছাড়া অন্যকোন আনুষ্ঠানিকতা থাকে না। 

নয়া খেসী 
বৌভাত অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সাতদিন পর প্রথমে বর পক্ষের আত্মীয়-স্বজনদের তরফ থেকে কয়েকজন নববধূর বাবার বাড়িতে যায় এবং ওই বাড়ির আপ্যায়নে অংশগ্রহণ করে আবার সেই দিনই ছেলের বাড়িতে ফিরে আসে, এ সময়ে নবদম্পতি সাথে যেতে পারে না। ছেলে পক্ষের আত্মীয় স্বজনকে কনের বাড়িতে বাধ্যতামূলকভাবে পান, সুপাড়ি, জর্দ্দা, মিষ্টি দ্রব্য নিয়ে যেতে হয়। পরবর্তীতে বৌভাতের ১৪দিন পর মেয়ে পক্ষের আত্মীয়-স্বজন বরের বাড়িতে যায় এবং নবদম্পতিকে নিয়ে ওই দিনই মেয়ের বাবার বাড়িতে ফিরে আসে। কনের পরিবারের তরফ থেকে এই অনুষ্ঠানকে নয়া গোষ্টী/নয়া খেসী/ নয়া ইষ্টি/নয়া নায়র বলে থাকে। এই অনুষ্ঠানে নবদম্পতি যেদিন কনের বাবার বাড়িতে যায় তখন কনের বাড়িতে প্রবেশের সময় নবদম্পতিকে চালনে রাখা প্রজ্জলিত প্রদীপ, পাকা ধান ও দূর্বা দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়। পূর্বের মত এ সময় ছেলেপক্ষের বাড়িতে যাওয়ার সময় কনে পক্ষকে বাধ্যতামূলকভাবে পান, সুপারি, জর্দ্দা, মিষ্টি দ্রব্য নিয়ে যেতে হয়। এছাড়াও নতুন বৌয়ের বাবার বাড়ি থেকে সাধ্যমত চেষ্টা করে বৈচিত্র্যময় পণ্যসামগ্রী নিয়ে বরের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। যে সকল আত্মীয়স্বজন নয়াখেসী অনুষ্ঠানে বরের ও কনের বাড়িতে যায় উভয়পক্ষই তাদের সামর্থ অনুযায়ী তাদেরকে নতুন কাপড় উপহার দিয়ে থাকে। 

ঘরভাঙ্গা
ডালুদের মধ্যে মূল বিয়ের অনুষ্ঠান সাধারণত কনের বাড়িতে হয়ে থাকে। কিন্তু কোন বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা যদি বরের বাড়িতে সম্পন্ন হয় সেক্ষেত্রে বরসহ বর পক্ষের সকলে কনের বাড়িতে যায় এবং কনের বাড়িতে কিছু রীতি-নীতি পালনের পর বরের বাড়িতে নিয়ে আসে। এই অনুষ্ঠানকে ডালুরা স্থানীয়ভাবে ঘরভাঙ্গার অনুষ্ঠান বলে থাকে।  ঘরভাঙ্গা অনুষ্ঠানে কিছু রীতি-নীতি পালন করা হয়ে থাকে, যেমন- কনের বাড়ির উঠানের কিছু অংশ পরিস্কার করে মাটি দিয়ে ল্যাপা (মাটি,পানি ও গরুর গোবরের তরল মিশ্রণ দিয়ে ভূমির ওপরের অংশে প্রলেপ দেয়া) হয়। ল্যাপা স্থানে কাসার  তৈরি একটি থালার মাঝে একটি মুছিতে (প্রদীপ জ্বালানোর জন্য মাটির বিশেষ পাত্র) খাছ (সরিষার) তেলের সাহায্যে হলতা (প্রদীপ জ্বালানোর জন্য কাপড়ের তৈরি উপাদান বিশেষ) জ্বালিয়ে রাখা হয়। প্রজ্জলীত মুছি সামনে রেখে বরের আসনে (কাঠের তৈরি পিড়ি) বরকে বসিয়ে কনের বাড়ি থেকে উপহার প্রদান করা হয়। সবশেষে বরপক্ষের আগত সকলের উপস্থিতিতে কনেপক্ষের সমাজের তরফ থেকে মেয়ের মামা বরপক্ষের সকলকে জিজ্ঞাসা করে যে, তারা কনেকে বুঝে পেয়েছে কি না? বরপক্ষ কন্যাকে বুঝে পেয়েছে বলে যদি স্বীকার করে তাহলেই এই আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে করা হয়। এছাড়াও যাবতীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করার পর কনের বাড়িতে ভোজের আয়োজন করা হয়। এরপর কনেকে বরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর বরের বাড়িতে বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। 

বিয়ে কেন্দ্রীক পূজা-পার্বণ 
কোন মা-বাবা যদি তার সন্তানের মঙ্গল কামনায় মানসী (দেবতার উদ্দেশ্যে মানত করা) করে থাকে তাহলে ওই সন্তানের বিয়ের সময় বাস্তুপূজা করা হয়। সাধারণত কোন পরিবারে বাস্তু দেবতার জন্য নির্ধারিত স্থানে এই পূজার আয়োজন করা হয়। ডালু বাবা-মায়ের বিশ্বাস হচ্ছে যেহেতু বর-কনে নুতন ঘর করতে যাচ্ছে, তাই তাদের মঙ্গলের জন্য গৃহ দেবতাকে পূজা  দেওয়া আবশ্যিক। মূল বিয়ের অনুষ্ঠানের ৩/৭ দিন আগে গৃহদেবতার উদ্দেশ্যে পূজার আয়োজন করা হয়। বর-কনে উভয়ের বাড়িতে এই পূজার আয়োজন হতে পারে। সাধারণত পরিবারের বয়োঃজৈষ্ঠ্য নারীরা পূজা পরিচালনা করে থাকে। পূজার সময় পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ও প্রতিবেশিরা উপস্থিত থাকে। বাস্তুগোপালের সন্তুষ্টির জন্য পূজায় বিভিন্ন ধরনের ফল, মিষ্টি ইত্যাদি উৎসর্গ করা হয়। পূজা শেষে সবার জন্য আতপ চাল, গুড়, কলা, দুধ, চিনি মিশিয়ে নৈবদ্য তৈরি করা হয়, ডালুরা এই নৈবদ্যকে আউলা প্রসাদ বলে। 

বিয়ের দিনে ভরা বিয়ের সময়ে কুঞ্জে পুরোহিত নব দম্পত্তির মঙ্গল কামনায় বিয়ের দেবতা হর-গৌড়’কে উদ্দেশ্য করে পূজা  দিয়ে থাকে। কুঞ্জে মূল বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরে ও বাসী বিয়ের আগে পুরোহিত যজ্ঞ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। মূলত এই যজ্ঞ অনুষ্ঠান হর-গৌড় দেবতাকে উদ্দেশ্যে করা হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিয়ের দিন নারায়ণ পূজার আয়োজন করা হয়। সনাতনী নিয়ম অনুযায়ী নারায়ণ পূজা ডালু সমাজের নিজস্ব অধিকারী দ্বারা পরিচালনা করা হত। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে ডালুদের কোন অধিকারী না থাকায় বর্তমানে হিন্দু পুরোহিত দ্বারা এই পূজা  সম্পন্ন করা হয়। 

ডেকরা  বিয়ে ও হাঙ্গা  বিয়ে
ডালুদের মধ্যে যেসকল পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না তারা বিয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় সংক্ষিপ্ত রীতি পালন করে থাকে। এই বিয়েতে পনরূপা অনুষ্ঠান করা হয় না। কনে পছন্দ হলে সরাসরি বিয়ের দিনক্ষণ ও লগ্ন নির্ধারণ করা হয়। বিয়ের খরচ কমানোর জন্য চার কোনায় চারটা বাঁশের কঞ্চি পুতে সাতনাল (সাত পাকের) সূতা দিয়ে ঘিরে কুঞ্জ বানানো হয়। এই বিয়ের রীতিতে বাসী বিয়ের প্রচলন নেই। এই রকম সংক্ষিপ্ত বিয়েকে ডালুরা ডেকরা বিয়ে বলে থাকে। বর্তমানে অধিকাংশ ডালু পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তারা ডেকরা বিয়েকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর্থিক দিক থেকে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল পরিবারসমূহ তাদের ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা পালন করার চেষ্টা করে। এ প্রসঙ্গে হাতিবান্ধা গ্রামের অধিকাংশ নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মতামত হচ্ছে তারা কষ্ট করে হলেও বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা ঐতিহ্যবাহী নিয়মে চর্চা করতে চায়। স্থানীয় এলাকায় বিনোদনের কোন সুযোগ না থাকায়। বিয়ের অনুষ্ঠান তাদের কাছে একটি বিনোদনের উপলক্ষ্য। 

কোন কারণে যদি স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে এবং ওই স্বামী পুনরায় বিয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে তখন সেই বিয়েকে হাঙ্গা বিয়ে বলে। ঠিক একই উপায়ে স্বামীর মৃত্যু ঘটলে যদি স্ত্রীর বিয়ের প্রয়োজন হয় তাহলে সেই বিয়েকেও ডালুরা হাঙ্গা বিয়ে বলে। ডালুদের ভাষ্য মতে, যদি কোন ব্যক্তি ২য় বিয়ে করতে চায় তবে সেই বিয়েকেও হাঙ্গা বিয়ে নামে আখ্যায়িত করা হয়। এই বিয়ে অনুষ্ঠানটি প্রচলিত বিয়ে অনুষ্ঠান থেকে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত আকারে আয়োজন ুকরা হয়ে থাকে। এই বিয়ের রীতি-নীতি ডেকরা বিয়ের আদলে পালন করা হয়। 
আইড়ো
বিয়ের সব কাজে বিভিন্ন ধরণের সহযোগিতার জন্য ৯ জন নারীকে নির্ধারণ করা হয়। স্থানীয়ভাবে বিয়ের বিশেষ কাজের জন্য নির্ধারিত নারীদেরকে ডালুরা আইড়ো বলে। সাধারণত সমাজের যেকোন ডালু নারী আইড়ো হতে পারে। বিশেষ করে বর-কনের সাথে যাদের হাসি-ঠাট্টার সম্পর্ক রয়েছে সেই সব নারীদের আইড়ো নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হয়। আইড়ো নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু সামাজিক নিয়ম মেনে চলা হয়, যেমন- 
কোন অবিবাহিত নারী আইড়ো হতে পারে না
কোন বিধবা নারী আইড়ো হতে পারে না
সমাজিকভাবে যে নারীকে ভালো চোখে দেখা হয় না তাকে আইড়ো নির্বাচন করা হয় না
সাধারণত কনের বাড়ির আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিরা কনে পক্ষের আইড়ো হয়ে থাকে
শুধুমাত্র নিজ ধর্মীয় গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত নারী আইড়ো হতে পারে  

ধর্ম বাপ (ধর্ম বাবা) ও ধর্ম মা   
বিয়ের জন্য একজন ধর্ম বাপ অথবা ধর্ম মা নির্ধারণ করা হয়। বিয়েতে ধর্ম বাপ কিংবা ধর্ম মাকে কিছু কর্তব্য পালন করতে হয়, যেমন-চড়াপানি সংগ্রহ করা, বিয়েতে স্বাক্ষী হিসেবে থাকা ইত্যাদি। সাধারণত আত্মীয়-স্বজনের মধ্য থেকে  বয়োঃজৈষ্ঠ্য কোন নারী ও পুরুষকে বর-কনের ধর্ম বাপ ও ধর্ম মা বানানো হয়। তবে বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বর পক্ষের বরের সম্পর্কে মামাকে ধর্ম বাপ বানানো হয়, যদি বরের কোন মামা না থাকে তাহলে মামা সম্পর্কের সমাজস্থ যেকোন ব্যক্তি ধর্মবাপ হতে পারে। ঠিক একইভাবে ধর্ম মা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বরের সম্পর্কে মামীকে বেছে নেয়া হয়। সেক্ষেত্রে ব্যক্তির বয়সকে প্রাধান্য দেয়া হয় না। তবে সাধারণত অধিকাংশ বিয়েতে ধর্ম মা নির্বাচনের চাইতে ধর্ম বাপ নির্বাচনকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন অসামাজিক কাজের প্রমাণ থাকলে তাকে ধর্ম বাপ বা ধর্ম মা সম্পর্কের বন্ধনে আনা হয় না।   

মিতা নির্বাচন ও মিতার ভূমিকা
ডালুদের বিয়েতে বরের ব্যক্তিগত কাজে সহযোগিতার জন্য এবং প্রচলিত আরো কিছু নিয়মনীতি পালনের জন্য একজন পুরুষ ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হয়। ডালুরা এই ব্যক্তিকে মিতা বলে। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী বরের আপন ভাই মিতা হতে পারে না। বরের ভাই সমতুল্য কোন ব্যক্তিকে মিতা হিসেব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। বয়সের বিচারে মিতা বরের বয়সের তুলনায় ছোট হতে পারবে না। অন্ততপক্ষে বরের সম বয়সী হতে হবে। তবে বরের কোন বন্ধু বিয়ের দিনে উপস্থিত না থাকলে সেক্ষেত্রে বিয়ের দিন কুঞ্জে বরের আপন ভাই ছাড়া পাত্রপক্ষের ভাই সম্পর্কের যেকোন ব্যক্তি এই দায়িত্ব পালন করতে পারে। ডালুরা মিতাকে বিয়ে পরবর্তী সবসময়ে ওই দম্পত্তির জন্য মিতা (বন্ধু) হিসাবে মনে করে থাকে। 

বিবাহোত্তর বাসস্থান ও বাসর রাত
বিবাহোত্তর বাসস্থান বলতে নব দম্পতির বসবাসের রীতিকে বোঝায়। সমাজভেদে বিবাহোত্তর বাসস্থানের রীতিতে বৈচিত্র্য রয়েছে। বিয়ের পর স্বামী যদি স্ত্রীকে নিয়ে তার (স্বামী) পিতার বাড়িতে বসবাস করে তখন তাকে পিতৃবাস বলে, আবার বিয়ের পর স্ত্রী যদি স্বামীকে নিয়ে তার (স্ত্রী) পিতার বাড়িতে বসবাস করে তখন তাকে মাতৃবাস বলে, অন্যদিকে দম্পতি যদি কোন তরফের পিতা/মাতার বাড়িতে বসবাস না করে সম্পূর্ণ নতুন করে বাসস্থান গড়ে তোলে তখন তাকে নয়বাস বলে। ঐতিহ্যগতভাবে ডালু সমাজে সাধারণত পিতৃবাস রীতি প্রচলিত। তবে বর্তমান সময়ে কিছু কিছু দম্পতি বিয়ের পর কিছুকাল পিত্রালয়ে বসবাস করার পর পিতার নয়াবাস তৈরি করে। ডালু সমাজ ব্যবস্থায় মাতৃবাসের প্রচলন না থাকলেও কোন কোন সময় জামাই রাখে (ঘরজামাই থাকা), ফলে স্বামী স্ত্রীর বাবার বাড়িতে থেকে যায়। ডালু সমাজ ব্যবস্থায় প্রচলিত জামাই রাখার রীতি অনেকাংশে মাতৃবাস রীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে উল্লেখ্য যে, ডালু সমাজ ব্যবস্থায় জামাই রাখা কোন সম্মানজনক রীতি হিসেবে বিবেচ্য নয়। 

প্রথম দিনে কুঞ্জে বিয়ে ও পরের দিন বাসী বিয়ে সম্পন্ন করে বর-কনেকে এই দিনই বরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর দিন বৌভাত অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। প্রচলিত ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে যে তারিখে বৌভাতের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় ওই তারিখের রাতকে কালরাত বলা হয়। এই দিন স্ত্রী তার স্বামীর সাথে রাত্রিযাপন করতে পারে না, এই রাতে স্বামী-স্ত্রী আলাদা আলাদা ঘরে রাত্রিযাপন করে। কালরাতের পরের রাত থেকে নব দম্পত্তি এক সাথে থাকতে পারে। মূলত ডালুরা বেহুলা-লক্ষ্মীনদরের কাহিনীতে বিশ্বাস স্থাপন করে এই রীতি পালন করে। তাই ডালুরা কালরাতের পর দিনকে বাসর রাত হিসেবে ধরে। এই প্রসঙ্গে ডালু সমাজে প্রবাদবাক্য হিসেবে প্রচলিত আছে- 
রবি, সোম, পরশু মঙ্গলবার
কাল প্রভু হবে সবই তোমার
বিয়ে অনুষ্ঠানের সবগুলো পর্বেই খাবারের ব্যাপারে কোন ধরণের বাধানিষেধ দেখা যায় না। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ এমন কোন খাবার, যেমন-গরুর বা মহিষের মাংস পরিবেশন করা হয় না। ডালুরা পরিবারের আর্থিক সামর্থ অনুযায়ী খাবারের আয়োজন করে। তবে বৌভাতের দিন অন্যান্য খাবারের সাথে আবশ্যিকভাবে দই চিড়া খাওয়ানোর প্রচলন রয়েছে। 

পূর্বকালে ডালুরা বিয়ে করে কনেকে পালকিতে করে বরের বাড়িতে নিয়ে যেত এবং বর পালকির সাথে সাথে হেঁটে যেত। আবার অনেক ক্ষেত্রে বর-কনে উভয়ে পালকিতে যেত। কিন্তু বর্তমানে পালকির প্রচলন নেই। বর্তমানে বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়ির দূরত্বের ভিত্তিতে যানবাহন নির্বাচন করা হয়। বর্তমানে যানবাহন হিসেবে রিক্সা, বাইসাইকেল, বাস ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।

ঘর ভেঙ্গে দেওয়া (বিবাহ বিচ্ছেদ) 
ডালু সমাজব্যবস্থায় বিবাহ বিচ্ছেদের প্রচলন নেই বললে চলে। কারণ ডালুরা বিশ্বাস করে কেবলমাত্র স্বামী অথবা স্ত্রী কারো মৃত্যু হলেই সাতপাকের বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়ে পারে। তবে নির্দিষ্ট কিছু কারণে কেউ যদি কোন স্বামী অথবা স্ত্রী এক সাথে সংসার করতে না চায় তাহলে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে। কোন পুরুষ বা নারী যদি সংসারের কাজে অবহেলা করে, অন্য কোন নারী বা পুরুষের সাথে সামাজিকভাবে স্বীকৃত নয় এমন সম্পর্ক গড়ে তোলে; তাহলে বিবাহ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা দেখা দেয়। যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রী অথবা স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চায় তাহলে ওই ব্যক্তিকে এই বিষয়ে প্রথমে সমাজকে জানাতে হয়। সমাজের সকলের সামনে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে উত্থাপিত বিষয়গুলো যদি সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং সমাজের সকলে যদি একমত পোষণ করে তাহলেই কেবল বিবাহ বিচ্ছেদ সম্ভব। সেক্ষেত্রে যে ব্যক্তি বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চায় তাকে সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত টাকা অপরপক্ষকে প্রদান সাপেক্ষে বিবাহের সম্পর্ক বিচ্ছেদ করতে হয়। উল্লেখ্য যে, ডালুরা বিবাহ বিচ্ছেদকে ‘ঘর ভেঙে দেওয়া’ বলে। 

জামাই রাখা 
ডালু সমাজব্যবস্থায় ঘরজামাই রাখার প্রচলন খুব বেশি দেখা যায় না। কারণ ডালু সমাজে ঘরজামাই প্রথাকে সম্মানজনক ভাবা হয় না। ডালুরা ঘরজামাই না বলে একে জামাই রাখা বলে থাকে। অতীতে জামাই রাখার প্রচলন একেবারেই ছিল না। কারণ হিসেবে পাকিয়াতলা গ্রামের দৈবকী (৫০) বলেন, আগে ডালুদের সম্পদের অভাব ছিল না, তাদের বসতবাড়িরও অভাব ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এমন অনেক পরিবার আছে যাদের কোন বসতবাড়ি নেই। সেক্ষেত্রে অনেক সময় মেয়ের বাবা-মা আয় করতে পারে এমন ডালু ছেলেকে তাদের মেয়ের বর হিসাবে তাদের বাড়িতেই জামাই রেখে দেয়। তাই বর্তমানে ডালু সমাজে ব্যবস্থায় জামাই রাখার প্রচলন কিছুটা হলেও বিদ্যমান।  

মৃত্যু, সমাধিকরণস্থ ও পারলৌকিক ক্রিয়া
পরিবারের কোন ব্যক্তি মারা গেলে সাধারণত পরিবারের বড় ছেলে আত্মীয়স্বজন ও সমাজের মানুষকে মৃত্যু সংবাদ জানায়। যদি বড় ছেলে না থাকে তাহলে বাড়ির অন্য যেকোন ছেলে সন্তান আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীকে মৃত্যু সংবাদ জানানোর ব্যবস্থা করে। সনাতনী প্রথায় ডালুরা মৃতদেহ দাহ করত। কিন্তু বর্তমানে ডালুরা মৃতদেহ দাহ না করে কবরস্থ করে। ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির প্রচলিত রীতি পরিবর্তনের কারণ হিসেবে বর্তমান সময়ের ডালুরা কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করে, যেমন- শবদেহ দাহ করার জন্য প্রয়োজনীয় শশ্মানঘাট (শশ্মান ভূমি) নেই। মৃতদেহ দাহ করার রীতি ডালুরা যে সব ভূমি শশ্মানঘাট হিসেবে ব্যবহার করত সেই সব ভূমি অধিকাংশ বেদখল হয়েগেছে। আর যেহেতু শশ্মানঘাট নেই তাই বাধ্য হয়ে বর্তমানে মৃতদেহ কবর দেয়া হয়। 
মৃতদেহ কবর দেয়ার প্রচলন প্রসঙ্গে আইয়োব তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ডালুরা একসময় মৃতদেহ দাহ করত, কিন্তু এখন শুধু মুখাগ্নি করে মৃতদেহ কবরস্থ করা হয়। মূলত উত্তর ময়মনসিংহে পাগলপন্থী (১৭৬৩-১৮৫২) বিদ্রোহীদের সংস্পর্শে আসার পর থেকে ডালুরা মৃতদেহ কবরস্থ করার প্রচলন শুরু করে (২০০৭:১১৯)।

পূর্বে কেউ মারা গেলে মৃতদেহ পারিবারিক তুলসী গাছের পাশে শুইয়ে রাখা হত। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃতদেহ মৃতের বাড়ির প্রধান বসবাসের ঘরের বারান্দায় রাখা হয়। কবর দেয়ার আগে প্রথমে মৃতদেহ সাবান দিয়ে স্নান করানো হয়। স্নানের পর তুলসীপাতা, চন্দন ও হলুদ একসাথে বেটে মৃতের সারা দেহে মেখে দেয়া হয়। ডালুরা বিশ্বাস করে যে, প্রতিটি নতুন জীবনের শুরুতে হলুদ মাখা একটি শুভ কাজ। যেহেতু মৃত্যুর পর ব্যক্তির নতুন আরেকটি জীবন শুরু হয় তাই মৃত্যু পরবর্তী জীবনের শুরুতে ব্যক্তির গায়ে হলুদ মাখা হয়। মৃতের সম্পূর্ণ শরীরে তুলসীপাতা, চন্দন ও হলুদ বাটা মাখার পর পুনরায় মৃতদেহ দ্বিতীয় বারের মত জল দিয়ে স্নান করানো হয়। মৃতদেহ স্নান করানোর জন্য বাড়ির উঠানে একটি জায়গায় বেড়া কিংবা কাপড় দিয়ে চারদিকে ঢেকে নেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, মৃতব্যক্তি পুরুষ হলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পরিবারের ও সমাজের পুরুষ সদস্যরা এবং মৃতব্যক্তি নারী হলে নারীরা স্নান করায়। স্নানের পর পুরুষদের সাদা ধুতি পরানো হয় এবং সাদা কাপড় দিয়ে সারা শরীর মুড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর মৃতদেহ কবরের পাশে নিয়ে যায় এবং শবযাত্রায় অংশগ্রহণকারী সবাই ধর্মীয় গান হিসেবে হরিনাম গাইতে থাকে। বর্তমানে মৃতদেহ কবর দেয়ার রীতি প্রচলিত হয়ে থাকলেও কবরস্থ করার পূর্বে ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুযায়ী মৃতদেহের মুখাগ্নি করা হয়। মৃতের মুখে আগুন দেয়ার রীতিকে ডালুরা মুখাগ্নি বলে। মুখাগ্নি করার জন্য প্রথমে মৃতের মুখে এক খন্ড পাটখড়ি (পাটকাঠি) দেয়া হয় এবং পাটখড়ির মাথায় সরিষার তেল মাখানো কাপড়ের সলতা লাগানো হয়। পরবর্তীতে পাটখড়ির মাথায় থাকা সলতায় আগুন জ্বালানো হয়, মৃতের মুখে আগুন দেয়ার চর্চাকে ডালুরা মুখাগ্নি বলে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বাবা-মায়ের বড় ছেলে মুখাগ্নি করে। যদি বড় ছেলে বেঁচে না থাকে তাহলে অন্য যেকোন ছেলে মুখাগ্নি করতে পারে। আর যদি মৃত ব্যক্তির কোন ছেলে সন্তান না থাকে তাহলে মৃতের ছোট/বড় ভাইয়ের যেকোন ছেলে সন্তান এই দায়িত্ব পালন করে থাকে। যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে মৃতের মামা কিংবা পাড়া প্রতিবেশির মধ্য থেকে যেকোন পুরুষ ব্যক্তি এই দায়িত্ব পালন করে। 

কবর তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণত উত্তর-দক্ষিণ দিকে ল¤¦া করে কবর খুঁড়া হয়। মৃত ব্যক্তির হাতের দৈর্ঘ্যরে পরিমাপের সাড়ে তিন গুণ পরিমাণ লম্বা এবং অন্ততপক্ষে একজন মানুষ বসতে পারে এমন উচ্চতা বজায় রেখে কবর তৈরি করা হয়। ডালুদের বিশ্বাস মতে, মৃত্যুর পরে যেহেতু আরেকটি জীবন, তাই ওই জীবনে যেন মৃত ব্যক্তি শান্তি মত শুয়ে থাকতে, বসে থাকতে কিংবা নড়াচড়া করতে পারে সেই দিক বিবেচনা করে কবর খুঁড়া হয়। ডালুদের বিশ্বাস কবর হচ্ছে মৃত্যুর পরের মৃতব্যক্তির নতুন ঘর। তাই কবরকে ঘরের আকৃতি দিতে কবরের উপরে বাঁশ, বাঁশের চাটাই দিয়ে এমনভাবে মাটি দেওয়া হয় যাতে করে উপরের মাটি নিচে না পড়ে। কবরের নিচের অংশে মৃতের ব্যবহৃত লেপ, তোষক ও বালিশ দিয়ে এর উপর মৃতদেহ শুইয়ে দেওয়া হয়। শুয়ানোর পূর্বে মৃতদেহ নিয়ে কবরের চারপাশে সাতটি পাক দেয়া হয় এবং তারপর মৃতদেহ কবরে শুইয়ে দেয়া হয়। কবরে রাখার পর মৃত ব্যক্তির কপালের উপর একটি কাঁচা টাকা (পয়সা) দেওয়া হয়। ডালুদের বিশ্বাস হচ্ছে পরপারে খেয়া পারের জন্য মৃতের কড়ি লাগবে তাই কাঁচা টাকা দেওয়া হয়। এছাড়াও মৃতের শিয়রে আতপ চাল ও একটি পাত্রে পানি এবং মৃতের ব্যবহৃত কিছু পুরোনো কাপড় রাখা হয় যাতে মৃত্যুর পর মৃতুব্যক্তির ক্ষুধা ও তৃষ্ণা লাগলে অনায়াসে তা ব্যবহার করতে পারেন। মৃত পুরুষের যদি বিবাহিত হয় এবং তার স্ত্রী যদি জীবিত থাকে তাহলে স্ত্রীর মাথার চুল দিয়ে আংটির মত করে বানিয়ে মৃত ব্যক্তির ডান হাতের মাঝখানের আঙ্গুলে পরিয়ে দেওয়া হয় এবং স্ত্রীর নিজের কপালে সিঁদুর লাগিয়ে মৃতের ডান পায়ের আঙ্গুল দিয়ে তা মুছে ফেলে। এক্ষেত্রে অনেকে মৃত ব্যক্তির পায়ের আঙ্গুল দিয়ে স্ত্রীর সিঁথির সিঁদুর মুছে দেয়। একইভাবে যদি কোন নারীর মৃত্যু হয় তাহলে তার মৃতদেহ একইভাবে নারীরা স্নান করায়। মৃতদেহ স্নান করানো হয়ে গেলে তাদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক পাথানির মতো করে একখন্ড সাদা কাপড় পরিয়ে মুখাগ্নির পর কবরস্থ করা হয়। মৃত নারীর স্বামী জীবিত থাকলে ওই নারীর ব্যবহৃত শাখা, সিঁদুর এবং অলংকারসহ কবর দেওয়া হয় এবং মৃত নারীর কপালে থাকা সিঁদুরের ফোটার ওপর কাঁচা পয়সা বসিয়ে দেয়ার পর কবরস্থ করা হয়। কবরের উপরের অংশ মাটি দিয়ে দো চালা ঘরের মতো করে বানিয়ে দেওয়া হয়। মৃতের পরিবার ব্যক্তির মৃত্যুর ১৩দিনে অশৌচ পালন করে। মৃত ব্যক্তির বয়স যদি পাঁচ বছরের মধ্যে হয় তাহলে তিন দিন নিরামিষ খেয়ে শ্রাদ্ধ করতে হয়। পাঁচ বছরের উর্ধ্বে হলেই ১৩দিন অশৌচ পালন করতে হয়।

অশৌচ চলাকালীন সময়ে পরিবারের পুরুষরা স্নানে কোন প্রকার সাবান ব্যবহার করতে পারে না, কুশাসন (কুশতৃণের তৈরি আসন)  ছাড়া বসতে পারবে না এবং মাথায় ছাতা, পায়ে জুতা বা স্যান্ডেল পরতে পারবে না। ১৩দিন কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করতে পারবে না। অশৌচ চলাকালীন সময়ে মৃতের পরিবারের কোন সদস্য চুল-দাঁড়ি কাটতে পারে না। অশৌচ অবস্থায় ১৩দিন ফলমূল জাতীয় খাবার খাওয়ার প্রচলন রয়েছে এবং তবে যদি কেউ ফলাহারে অক্ষম হয়, তাহলে একবেলা নিরামিষ খাবার খেতে দেওয়া হয়। 

হবিস  অন্ন 
পরিবারের যে ব্যক্তি মুখাগ্নি করবে তাকে এবং মৃতের পরিবারের অন্য সব ছেলেদেরকে কিছু রীতিনীতি পালন করতে হয়। ব্যক্তি যেদিন মারা যায় সেদিন থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত পরিবারের সকল সদস্য শুধুমাত্র দুধ, কলা এবং অন্যান্য ফল ছাড়া অন্য কিছু খেতে পারে না। মৃতের পরিবাররের সদস্যদেরকে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের আগের দিন পর্যন্ত নিরামিষ খাবার খেতে হয়। এছাড়াও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের মৃত্যুর পর তিন দিন পর্যন্ত নিরামিষ খাবার খেতে হয়। যে ব্যক্তি মুখাগ্নি করবে তাকে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের পূর্ব দিন পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি ধুতি পড়ে কাটাতে হয় এবং কোন ক্রমে ওই ধুতি পরিবর্তন করা যাবে না। তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠান শেষ করে তবেই নতুন কাপড় পড়তে পারবে। ওই ব্যক্তিকে ব্রত পালন করতে হয়, যেমন-সে অন্য কারো রান্না করা খাবার খেতে পারবে না এবং নিজে রান্না করে খাবার খেতে হয়। অন্ন রান্না এবং খাওয়ার সময় কোন ধরনের শব্দ হলে রান্না কিংবা খাওয়া শুদ্ধ হয় না বলে ডালুরা বিশ্বাস করে। সেই জন্য সাধারণত রাত্রি দ্বি-প্রহরে অন্ন রান্না করা হয়। যদি এমন হয় খাওয়ার সময় কোন টিকটিকি ডাকে তাহলে খাওয়া বন্ধ করে দিতে হয়। প্রতিদিন একটা করে মাটির হাঁড়িতে রান্না করার পর ওই হাঁড়ি ভেঙ্গে ফেলতে হয়। মৃত্যুর ক্রীয়ানুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিয়ম চলতে থাকে। ডালুরা এই রীতি চর্চাকে হবিস অন্ন বলে। 

বর্তমানে হবিস অন্ন প্রথা চর্চায় পূর্বে প্রচলিত নিয়ম-নীতি সূচারুভাবে পালন করা হয় না। কারণ হিসেবে ডালুদের মধ্যে প্রবীণ ব্যক্তি সরেন সাধু বলেন-এই যুগের ছেলে-মেয়েরা ধর্মীয় বিধি-নিষেধ আগের মত মানতে চায় না এবং ধর্মীয় রীতি-নীতি পালনের কষ্ট সহ্য করতে পারে না। হরিস অন্ন ব্রত চর্চায় অন্ন রান্নার জন্য আতপ চালের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া প্রতিদিন একটা করে হাঁড়িতে রান্না করে সেই হাঁড়ি ভেঙ্গে ফেলতে হয়। যার ফলে বেশ কিছু অর্থের যোগন দিতে হয়। তাই পরিবারের তরফ থেকেও হবিস অন্নের প্রতি অনাগ্রহ দেখা যায়। 

শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান 
বর্তমানে মৃতের পরিবার ব্যক্তির মৃত্যুর ১১/১৩/১৫ দিনে অশৌচ পালন করে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করে। ১৩২৩ বঙ্গাব্দের পূর্বে মৃতের পরিবার মৃত্যুর পর ৩০দিন পর্যন্ত অশৌচ পালন করে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করত। সেই সময় ডালু সমাজের অধিকারীরা শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের ধর্মীর রীতি-নীতি পরিচালনা করত। বর্তমানে হিন্দু ব্রাহ্মণ দ্বারা শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করা হয়। শ্রাদ্ধের দিন যে ব্যক্তি হবিস অন্ন ব্রত পালন করে শীল (নাপিত) দ্বারা তার চুল ও দাঁড়ি কামানো এবং নখ কাটা হয়। পাশাপশি শীল দ্বারা বাড়ির অন্যদের চুল কাটা না হলেও অন্ততপক্ষে চুলে এবং নখে খুড় স্পর্শ করানো হয়। সমাজের সবাই যদি চায় তাহলে তারাও চুল-দাঁড়ি কামাতে পারে। শ্রাদ্ধের দিন মৃতের বাড়ি-ঘর শুদ্ধ করা হয়। বাড়ি-ঘর শুদ্ধ করার জন্য প্রথমে একটি পাত্রে পানি নেয়া হয়, পরবর্তীতে সেই পানিতে কিছু অংশ সোনা বা রূপা সাতবার ভেজানো হয় এবং ওই পানিতে সাতটি ধান, সাতটি তুলসী পাতা মিশিয়ে ওই জল পুরো ঘর-বাড়িতে ছিটিয়ে দেয়া হয়। শ্রাদ্ধ্য অনুষ্ঠানের দিন মৃত ব্যক্তির বাড়ির উঠানে বিয়ের কুঞ্জের মত করে ছোট আকৃতি কুঞ্জ বানানো হয়। কুঞ্জের মাঝখানে চন্দন কাঠ দিয়ে চিতার আকৃতির মত করে ছোট চিতা বানানো হয়। সেখানে আগুন জ্বালিয়ে পূর্ব দিকে মুখ করে পুরোহিত যজ্ঞ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। যজ্ঞের সময় পুরোহিতের ডান পাশে যে ব্যক্তি হবিসঅন্ন ব্রত পালন করেছেন তিনি সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিত থাকেন। এছাড়া হবিসঅন্ন ব্রত পালনকারী ব্যক্তি পুরোহিতের সহায়তায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শ্রাদ্ধের যাবতিয় মাঙ্গলিক ক্রিয়া সম্পন্ন করেন। সবশেষে মৃতব্যক্তির আত্মার মঙ্গল কামনায় শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই মিলে প্রার্থনা করে। এরপর নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের খাবার পরিবেশন করা হয়। উল্লেখ্য যে, শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের দিনে কোন প্রকার আমিষ জাতীয় খাদ্য খাওয়ার প্রচলন নেই। উল্লেখ্য যে, ডালুদের মধ্যে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পিন্ডদান করার প্রথা প্রচলিত আছে, যা বহুলাংশে সনাতন হিন্দু রীতি অনুযায়ী করা হয়ে থাকে। সাধারণত কোন তীর্থস্থানে পিন্ডদান আচার পালন করা হয় এবং এই আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য ডালুরা ব্রাহ্মণের সাহায্য গ্রহণ করে। 

শেষ কথা: 
ডালুদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত ও তথ্যবিতর্ক প্রচলিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডালুরা একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে দীর্ঘদিন যাবত বাংলাদেশে বসবাস করছে। পর্যালোচিত ইতিহাস ও মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যসূত্রের সমন্বয়ে বলা যায় যে, ডালুদের ধর্মীয় দর্শনে বেশ কয়েকবার বিশ্বাসগত পরিবর্তন এসেছে। সনাতন ধর্ম গ্রহণের পূর্বে ডালুদের আদি ধর্মরূপ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কিছু ব্যাখ্যা থাকলেও সেটা সুস্পষ্ট নয়। তবে আদি ধর্মের কিছু রীতিনীতি প্রবীণ ডালুদের স্মৃতিতে আজো অম্লান। সনাতনী চর্চার কিছু কিছু পূজাপার্বণ আজো পালন করা হয়, কিন্তু সেই সব চর্চায় নিয়মনীতির আংশিক পরিবর্তন হয়েছে। বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর থেকে ডালুরা নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা শুরু করে। তবে বর্তমানে নিরাকার ঈশ্বর উপাসনার পাশাপশি ডালুরা বাঙালি হিন্দু মত বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি তৈরি করে পূজা-অর্চনা করছে। ডালুদের ধর্মীয় জীবনে আদর্শ পুরুষ হিসেবে সানু পাগল এক অন্যতম চরিত্র। অতীতে সানু পাগলের মন্দিরে ডালুরা নানা ধরনের ধর্মীয় উৎসব পালন করত। সম্প্রতি স্থানীয় বাঙালিদের দ্বারা মন্দির ও মন্দিরের জমি দখল হয়ে যাওয়ার ফলে ডালুদের সানু পাগলের মন্দির আজ সানু পাগলের মাজারে পরিণত হয়েছে। সানু পাগলের মন্দিরে ডালুদের স্বাভাবিক প্রবেশাধিকার আজ রুদ্ধ প্রায়। ফলে সানু পাগলের উপর ডালুদের ধর্মীয় বিশ্বাস অটুট থাকলেও সানু পাগলকে কেন্দ্র করে অতীতে প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠান আজ বিলুপ্ত প্রায়। 

লেখক: মো. এরশাদ আলী, গবেষক, বারসিক,ঢাকা,০১৭১৬২৭৫৫৯৫ 


মন্তব্যসমূহ