তুলসী চাষ ও তুলসী পাতা থেকে চা প্রক্রিয়াকরণ


তুলসী গাছের পাতা থেকে চা তৈরির প্রক্রিয়াটি বা রীতিটি সর্বপ্রথম গাইবান্ধায় শুরু করেন পল্লীবধু কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মিসেস মনোয়ারা তালুকদার। তুলসী গাছের পাতা থেকে চা উৎপাদনের ধারণাটি সম্পর্কে তিনি সর্বপ্রথম জানতে পারেন ২০০৪ সালে ঢাকার শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত চৎধপঃরপধষ অপঃরড়হ নাম একটি বেসরকারি  প্রতিষ্ঠান কৃর্তক আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার থেকে। 

পরবর্তীতে তিনি গাইবান্ধার ফরিদপুর ইউনিয়নের আবুল হোসেন ও রংপুরের মিঠাপুকুর মির্জাপুরের ইসলামপুর (ইসমাইলপুর ) গ্রামের মিজানুর রহমান মিন্টু নামক দু’জন কৃষককে ২৫০ গ্রাম করে বীজ প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে ফরিদপুর ও মিঠাপুকুর মির্জাপুরে ২টি সেন্টার গড়ে তোলা হয় যার মাধ্যমে ফরিদপুর ১১২ জন কৃষক ও মিঠাপুকুর মিশাপুরে ৭১ জন কৃষক তুলসী চাষ করেছিল। 

পরবর্তীতে ২০১০ সালে ফরিদপুর সেন্টারে ৪৭ জন কৃষক তুলসী চাষ করেছিল। বর্তমানে ২০১১ সালে চাষীর সংখ্যা কিছুটা কমে গেছে এবং, চাষ প্রক্রিয়াতে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই বছর থেকে কৃষকদের পল্লীবধু কল্যাণ সংস্থা চক্রাকারে তুলসী চাষ করতে পরামর্শ দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিবারে ৮-১০ জন কৃষককে তুলসী চাষ করতে বলা হয়েছে এবং এই বছর কৃষকেরা এভাবেই তুলসী চাষ করেছে। এভাবে চাষ করতে বলার কারণ হচ্ছে তুলসী চা এর চাহিদা এক, প্রচারণা অনেক কম হওয়াতে এর বিক্রি অনেক কম। যে জন্য বেশী পরিমাণ তুলসী পাতা উৎপাদন হলে তা অবিক্রিত থেকে যাবে। তুলসী পাতার একমাত্র ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে পলী­বধূ কল্যাণ সংস্থা। পল্লীবধু কল্যাণ সংস্থাই কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচা ও শুকনো তুলসী পাতা কিনে থাক এবং তাদের নিজস্ব মেশিন এর সাহায্যে সেগুলোকে চা এ রূপান্তরিত করে থাকে। কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা বেশি ভালো না হওয়ার দরুণ তারা সীমিত পরিমাণ কাচা বা শুকনো তুলসী পাতা কিনতে পারে। তাদের মতে যদি তুলসী চা এর ব্যবহার সম্পর্কে জনসাধারণকে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে জানানো যায় তবে তা তুলসী চাষীদের জন্য খুব উপকারী হবে এবং তুলসী চাষ ক্রমাগত বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে যাবে। 

গাইবান্ধা জেলার শাদুল্্যাপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের ভাজাকেলাই মোড় ও রংপুর জেলার মিঠাপুকুর মির্জাপুর উপজেলার ইসমাইল পুর (ইসলামপুর) গ্রাম। 


পতিত অথবা কম উৎপাদনশীল ফসলী জমিতে অধিক লাভজনক তুলষী চাষ: গ্রাম্য অর্থনীতিতে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ফসল। 


স্থানীয় কৃষকদের মতে, এবং  পল্লীবধু কল্যাণ সংস্থার মতে, তুলসী সাধারণত একটু উচু জমিতে চাষ করতে হয় এবং বেলে-দোঁআশ মাটিতে এটির উৎপাদন ভালো হয়। স্থানীয় কৃষকেরা সাধারণত তাদের বাড়ির আশেপাশের পতিত অথবা কম উৎপাদনশীল ফসলী জমিতে তুলসী চাষ করছে। তাদের অভিমত যে, যে সকল জমিতে সাধারণত কোন কিছুই উৎপাদন হয় না বা করা যায় না সেই সকল জমিতে ও তুলসী চাষ করা যায় এবং ভালো ফসল পাওয়া যায়। তুলসী চাষের জন্য স্থানীয় কৃষকেরা জানুয়ারীর শেষের দিকে অথবা ফেব্র“য়ারীর শুরুতে বীজতলা তৈরি করে বীজবপণ করে থাকে। এক্ষেত্রে তারা (কৃষকেরা) সাধারণত বাবই জাতের তুলসী বীজ বপন করে থাকে কেননা এটি সব জায়গায় পাওয়া যায়। তুলসীর অন্য যে ৩টি জাত রয়েছে যেমন রাম, কৃষ্ণ, রাধা (সাদা তুলসী) যেগুলো খুব একটা পাওয়া যায় না। 

বীজ তলায় বীজ রোপণ করার ২০-২৫ দিন পর যেগুলো জমিতে লাগানোর উপযুক্ত হয়। জমিতে চারা লাগানোর পূর্বে ৪ বার ভালো চাষ দিতে হয়। চারা লাগানোর পরে সাধরণত ২-৩ বার সেচ দিলেই হয় তবে কম বৃষ্টিপাত বা খরা মৌসুমে সেচ লাগে কেননা তখন আশেপাশের জমিগুলোতে বোরো চাষ করা হয় সে সব জমিতে পানি অনেক সময় জমে থাকে। তুলসী চাষের ক্ষেত্রে ফরিদপুরে ভেজাকেলাই মোড় সেন্টার এর  অন্তর্ভুক্ত চাষীরা/কৃষকেরা সাধারণত বছরে একবারই চারা রোপণ করে থাকে অন্যদিকে মিঠাপুকুর মির্জাপুর সেন্টারের অন্তর্গত কৃষকেরা ২ বার চারা রোপণ করে থাকে। এক্ষেত্রে চারা রোপন করার ৪৫ দিন পর কৃষকেরা প্রথমবার তুলসী পাতা কাটতে বা সংগ্রহ করতে পারে। এক্ষেত্রে যে সকল সাধারণত বছরে ১ বার চারা রোপণ করতে থাকে তারা সাধরণত এভাবে ৪৫ দিন পর পর সর্বোচ্চ ৬ বার বছরে পাতা সংগ্রহ করতে পারে তবে যদি জমি বেশি উভয় হয় সেক্ষেত্রে বছরে ৮ বার পাতা সংগ্রহ করা যায়। আর যে সকল কৃষক বছরে ২ বার চারা রোপণ করে থাকে তারা সাধারণত প্রতি বারে ৩ বার করে পাতা সংগ্রহ করতে পারে। তুলসী সাধরণত শীতের মৌসুমে বিশেষ করে পৌষ-মাঘ মাসে চাষ করা যায় না। তুলসী চাষের ক্ষেত্রে সাধরণত কোন রাসায়নিক সার ও ঔষুধ/কীটনাশক এর প্রয়োজন পড়ে না তবে অনেক কৃষক কীটনাশক হিসেবে মেহগণির ফল গুঁড়া করে পানির সাথে মিশিয়ে তুলসী গাছের ছিটিয়ে থাকে। 
প্রতি বিঘা জমিতে তুলসী চাষে খরচ
খরচের খাতা খরচ
চারা ১৯৫০/= (৬৫০০ চারা লাগে, প্রতি হাজার চারা ৩০০ টাকা) 
চাষ ৬০০/= (৪ বার চাষ প্রতি বারে ১৫০/=) 
নিড়ানী ৯০০/= (৩ টি শ্রমিক, প্রতি শ্রমিক ৩০০/=) 
 সেচ ৪০০/= (৪টি সেচ, প্রতি সেচ ১০০/= 
কাটিং ৯০০/= (৩টি শ্রমিক, প্রতিটি ৩০০/-) 
মোট খরচ ৪৭৫০/=

প্রতি বিঘা জমিতে তুলসী চাষে সর্বমোট খরচ হয় ৪৭৫০ টাকা সেখানে প্রতি বিঘা জমিকে কাঁচা পাতা সংগ্রহ করা যায় প্রায় ৭০০ কেজি এক, প্রতি ১০ কেজি কাঁচা পাতা থেকে ১ কেজি শুকনা পাতা পাওয়া যায়। কৃষকদের কাছ কাঁচা পাতা প্রতি কেজি ২০ টাকা করে শুকনো পাতা প্রতিকেজি ২০০/= টাকা দরে পল্লীবধু কল্যাণ সংস্থা কিনে নেয়। সে হিসেবে ৭০০ কেজি কাঁচা পাতার মূল্য আসে ১৪০০০ টাকা অর্থাৎ  তুলসী চাষে লাভ হয় ৯২৫০ টাকা। অর্থাৎ তুলসী চাষ বর্তমান বাজার প্রেক্ষিতে তুলনামূলকভাবে অনেক লাভজনক। বর্তমান মৌসুমে অনেক কৃষক তুলসী কে সাথী ফসল হিসেবে কলাবাগানে এবং হলুদের সাথে চাষ করছে পরীক্ষামূলকভাবে। 

পল্লীবধু কল্যাণ সংস্থার হিসাব অনুসারে ২০১০ সালে ২নং সেন্টারে ৪৭ জন কৃষক মিলে ৩৪০৫ কেজি শুকনো তুলসী পাতা উৎপাদন করেছে যেটির বাজার মূল্য ৬,৮১,০০০ টাকা প্রতি কেজি ২০০ টাকা দরে এবং ১ নং সেন্টারে ২০০৯ সালে ৫৬৮৭ কেজি কাঁচা পাতা উৎপাদন করেছে কৃষকেরা যার বাজারমূল্য ১১,৩৭৪০ টাকা এক, ১০৫ কেজি শুকনো পাতা উৎপাদন করেছে যার বাজার মূল্য ২১,০০০ টাকা। 

স্থানীয় কৃষকদের মতে, তুলসী চাষ অনেক লাভজনক, কেননা আগে যেসব জমিতে তারা কোন কিছুই আবাদ করতে পারত না এখন সেসব জমিতে তুলসী চাষ করে অনেক অর্থ তারা পাচ্ছে। তুলসী চাষে কোন প্রকার রাসায়নিক সার ও ওষুধ প্রয়োজন হয় না এতে করে পরিবেশের উপর ও কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না। পাশাপাশি জমির উর্বরতাও  নষ্ট হচ্ছে না। তাছাড়া তুলসী চাষে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে তুলসী গাছ গরু-ছাগল খেতে পারে না। সে জন্য তুলসী চাষে বেড়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যার ফলে ফসলও কম নষ্ট হয়। তুলসী চাষের মধ্য দিয়ে স্থানীয় মহিলাদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। আগে যে সময়টাতে মহিলারা ঘরে বসে থাকত এখন তারা তুলসী চাষে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারছে। তুলসী পাতা সংগ্রহের ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকেরাই বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। কেননা নারীরা তুলসী গাছ থেকে পাতা অনেক যতœ নিয়ে সংগ্রহ করে থাকে (স্থানীয় কৃষকের মতে)। মহিলা শ্রমিকদেরকে দৈনিক ১০০ টাকা মজুরী দেয়া হয়। বাড়ির আনাচে কানাচে এখন তুলসী চাষ করে অনেক নারীই তার সংসারে অন্যান্য চাহিদা পূরণ করতে পারতেছে কারণ তুলসী চাষে খুব বেশি শ্রমের প্রয়োজন হয় না। তুলসী গাছ জ্বালানী হিসেবেও অনেক কার্যকর। 

এছাড়াও তুলসী চা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী ও বটে। তুলসী চা, সর্দি, কফ, কাশি ও এজমা নিয়ন্ত্রন সহ শ্বাসতন্ত্রের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে; ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ মিশ্রণ করে ইত্যাদি। তুলসী চা পানে কোন পার্শ্চ প্রতিক্রিয়া হয় না। তুলসী চাষীরা তুলসী চাষের মধ্য দিয়ে তুলসী চা পানের মাধ্যমে এসব রোগের ক্ষেত্রে তাদের অনেক উপকার হয়েছে (স্থানীয় কৃষকদের মতে)। 

স্থানীয় কৃষক ও পল্লীবধু কল্যাণ সংস্থার মতে তুলসী চাষের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা হচ্ছে তুলসী চা বাজারজাতকরণ ও প্রচারণার অভাব। তাদের মতে, প্রচারণা ও বাজারজাতকরণ বৃদ্ধি করতে পারলে কৃষকেরা আরও বেশি পরিমানে তুলসী চাষ করতে পারবে। 

এছাড়াও স্থানীয়ভাবে তুলসী পাতার চা তেমনভাবে সামদৃত হতে পারেনি এখনও। এর কারণ হিসেবেও স্থানীয় কৃষক ও পল্লবধু কল্যাণ সংস্থা প্রচারণার অভাবকে দায়ী করছে। তারা মনে করে যদি সরকারিভাবেও বেসরকারিভাবে এর প্রচারণা বৃদ্ধি করা করা যায়। এক, সরকারিভাবে/বেসরকারিভাবে এর বাজারজাত করলে সাহায্য করা যায় তবে অচিরেই তুলসী চাষ একটি ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে পরিণত হতে পারবে যার মাধ্যমে অনেক দরিদ্র কৃষক পরিবার লাভবান হতে পারবে এর পাশাপাশি তুলসী চা পানের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের মাত্রাও অনেক কমে যাবে। 

মন্তব্যসমূহ